আজ বুধবার, ৫ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং, ২৮শে জিলহজ্জ, ১৪৩৮ হিজরী, শরৎকাল, সময়ঃ রাত ১০:৪২ মিনিট | Bangla Font Converter | লাইভ ক্রিকেট

আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও এর প্রাসঙ্গিকতা

 

বাংলাদেশ বহু জাতি, বহু ভাষা ও বহু ধর্মের দেশ। বাংলাদেশে বাঙালী ছাড়াও পাহাড় ও সমতল অঞ্চল মিলে ৪৬টির অধিক আদিবাসী জাতি বাস করে। স্মরণাতীত কাল থেকে তারা এ অঞ্চলে বসবাস করে আসছে। এ অঞ্চলের ভুমিকে বাসযোগ্য ও চাষযোগ্য করার ড়্গেত্রে আদিবাসীদের রয়েছে বিশেষ অবদান। বৃটিশ উপনিবেশবাদী শাসকগোষ্ঠী ও পাকিসত্মানী শাসকগোষ্ঠীকে এদেশ থেকে বিতাড়নে আদিবাসীদের রয়েছে ঐতিহাসিক ভূমিকা। কিন্তু যে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী এ অঞ্চলের ভুমিকে চাষ ও বাসযোগ্য করে তুলেছে, বৃটিশ ও পাকিসত্মানী শাসকগোষ্ঠীকে বিতাড়ণ করে এদেশ স্বাধীন করার ড়্গেত্রে গুরম্নত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, সেই আদিবাসী জাতিসমূহ স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে স্বীকৃতি পেলো না- এর চেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা আর কি হতে পারে। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের সংবিধানে স্মরণাতীত কাল ধরে এদেশে বসবাসরত আদিবাসী জাতিসমূহের স্বীকৃতি প্রদান করা হয়নি।

আদিবাসীরা যুগ যুগ ধরে শোষন বঞ্চণার শিকার হয়ে আসছে। পাকিসত্মানী শাসকগোষ্ঠী আদিবাসী-বাঙালী নির্বিশেষে পূর্ব পাকিসত্মানের জনগণের উপর শোষন, বঞ্চণা ও নিপীড়ণ চালায়। এই শোষন নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাংলার জনগণ সংগ্রাম গড়ে তুলে। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন মুক্তিযুদ্ধের ডাক দেয় তখন সে ডাকে সাড়া দিয়ে এদেশের আদিবাসীরাও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। যুদ্ধে বহু আদিবাসী শহীদ হন। আদিবাসীরা আশা করেছিল দেশ স্বাধীন হলে এ নতুন দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পাবে। প্রতিষ্ঠা পাবে শোষণহীন এক অসাম্প্রদায়িক সমাজ, যে সমাজে নিপীড়ন-নির্যাতন ও শোষণ-বঞ্চনা থাকবে না, থাকবে না দ্বেষ-হিংসা-হানাহানি। এ ধরনের সমাজে আদিবাসীরাও স্বকীয় বৈশিষ্ট্য, সংসৃ্কতি ও অধিকার নিয়ে মর্যাদার সাথে বসবাস করতে পারবে- এ ছিল তাদের স্বপ্ন। কিন্তু ১৯৭২ সালে যখন নতুন দেশের সংবিধান রচনা করা হল তখন আদিবাসীদের স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেল। যে নতুন সংবিধানের জন্য আদিবাসীরাও রক্ত দিল, জীবন দিল সেই নতুন সংবিধানে আদিবাসীদের স্বীকৃতি মিললো  না- সত্যিই তা আদিবাসীদের জন্য হদয় বিদারক ঘটনা বৈ কি! ১৯৭২ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংসদ সদস্য আদিবাসী তথা মেহনতি মানুষের বন্ধু এম এন লারমা জাতীয় সংসদে সংবিধানের উপর দীর্ঘড়্গণ বক্তব্য রেখেছিলেন। তিনি আদিবাসীদের পরিচয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের জন্য আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার এবং দেশের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের অধিকার সংবিধানে সুদৃঢ়ভাবে স্থাপনের দাবী জানিয়েছিলেন।

সাম্প্রতিক সংবিধান বিষয়ে মহামান্য হাইকোর্টের রায় আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি পাবার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। হাইকোর্ট সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে দিয়েছে। হাইকোর্টের রায়কে বিবেচনা রেখে মহাজোট সরকার সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এলড়্গে সরকার বেগম সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে চেয়ার এবং সুরঞ্জিত সেন গুপ্তকে কো-চেয়ার করে সংবিধান সংশোধন সংক্রানত্ম সংসদীয় কমিটি গঠন করেছে। সংবিধান সংশোধন সংক্রানত্ম বিশেষ কমিটির নিকট পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সংগঠন জনসংহতি সমিতিসহ দেশের বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠন, সরকারী দলের পাঁচ এমপি, আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাস লিখিত দাবী পেশ করেছে। এসব সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গ এদেশের আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান পূর্বক ভ’মির উপর তাদের প্রথাগত অধিকার, স্বশাসন ও তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকার সংবিধানে স্বীকৃতি প্রদানের দাবী জানিয়েছে। দেশের সমাজবিজ্ঞানী, বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, লেখক ও নাগরিক সমাজ আদিবাসীদের এ দাবীর সাথে সংহতি প্রকাশ করে আদিবাসীদের দাবী মেনে নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছে।

 সাংবিধানিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে জাতিগত পরিচিতিঃ

আদিবাসী ও তাদের সংগঠনগুলো, সর্বোপরি নাগরিক সমাজের দাবীনামাকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে গত ১৫ মার্চ ২০১১ সংবিধান সংশোধন বিষয়ক কমিটির কো-চেয়ার সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন- অষ্ট্রেলিয়া, আমেরিকায় যে অর্থে আদিবাসীরা ‘আদিবাসী’ এদেশের আদিবাসীরা সে অর্থে আদিবাসী নয়। তাই তাদের আদিবাসী হিসেবে নয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে সংবিধানে স্বীকৃতি প্রদান করা হবে।

আদিবাসী কারা? এ নিয়ে অনেকের মাঝে বিভ্রান্তি লক্ষ্য করা যায়। খোদ রাষ্ট্রের বড় বড় পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের মাঝেও বিভ্রান্তি লক্ষ্যনীয়। সরকারের বড় বড় আসীন ব্যক্তিরাও নাকি প্রশ্ন তোলেন- ‘আপনারা উপজাতিরা এদেশের আদিবাসী হলে আমরা কারা? আমরাও তো এদেশের আদিবাসী’। কিন্তু ‘আদিবাসী জাতি’ নির্ধারণে কে আদি বাসিন্দা বা কে আদি বাসিন্দা নয় তা একমাত্র নির্ণায়ক বিষয় নয়। আদিবাসী হলো তারাই- ১. বর্তমানের রাষ্ট্র শাসন প্রক্রিয়ায় যাদের একেবারেই প্রানিত্মক ভূমিকা, ২. আধুনিক রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়ার সাথে যাদের অসম্পৃক্ততা বা প্রানিত্মক সম্পৃক্ততা, ৩. যারা রাষ্ট্রীয় আইনের চাইতে প্রথাগত আইনের মাধ্যমে আভ্যনত্মরীণ সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তি করে থাকে, ৪. প্রথাগত আইন কার্যকর করার জন্য যাদের ঐতিহ্যগত প্রতিষ্ঠান রয়েছে, ৫. যাদের ভুমির সাথে বিশেষভাবে আত্মিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে- এসব বৈশিষ্ট্য যাদের রয়েছে তাদেরকেই ‘আদিবাসী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এসব বৈশিষ্ট্যের আলোকে এদেশের আদিবাসীদের নির্ধিদ্বায় ‘আদিবাসী’ হিসেবে অভিহিত করা যায়- সরকার বা অন্য কারোর এক্ষেত্রে দ্বিধা থাকা সমীচিন নয়।

সরকারের কর্তাব্যক্তি অনেকের মাঝে এ ধারণাও নাকি আছে যে, এদেশের আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হলে আদিবাসীরা বাঙালীদের চেয়ে বেশী অধিকার ভোগ করবে, তারা বহু অধিকার ভোগ করবে- এ ধরণের নেতিবাচক ধারণা নাকি কাজ করে। এ ধরণের ধারণা সত্যিই হাস্যকর। আদিবাসীরা কি কখনো রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সেনাবাহিনীর প্রধান হতে পারবে? আদিবাসীরা কি এদেশে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে পারবে? যে আদিবাসীদের অসিত্মত্ব আজ বিপন্ন, যারা তাদের চিরায়ত ভূমি হারাতে হারাতে আজ প্রানিত্মক অবস্থানে নিপতিত, যারা আজ তাদের ভাষা, সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলছে- এসব আদিবাসীদের ভূমি, ভাষা, সংস্কৃতি ও অসিত্মত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য অধিকার দিতে রাষ্ট্রের এত কার্পণ্য কেন? রাষ্ট্র কি আদিবাসীদের ধ্বংস চায়?

আজ পার্বত্য চট্টগ্রামের খ্যাং ভাষা নি:শেষ হতে চলেছে, সমতলের কোচ, বর্মণসহ বহু আদিবাসী জাতি তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলেছে। হাজার হাজার আদিবাসী পরিবার তাদের চিরায়ত ভ’মি থেকে উচ্ছেদ হয়ে আজ তারা ভূমিহীন, নি:স্ব। এটাই প্রমাণ করে বর্তমানে রাষ্ট্র আদিবাসীদের যেটুকু অধিকার প্রদান করছে তা আদিবাসীদের ভ’মি, তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও অস্তিত্ব রক্ষা করে দিতে পারছে না। তাই আদিবাসীদের ভ’মি ও তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও অস্তিত্ব রক্ষার জন্য তাদের জন্য আরো অধিক পরিমানে অধিকার দরকার। রাষ্ট্রকে এ অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের সংবিধানে আদিবাসীদের স্বীকৃতি না থাকলেও এদেশের আদিবাসীরা রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত। রাষ্ট্রের বিভিন্ন আইন, প্রজ্ঞাপন, নির্দেশনা, পলিসি, হাইকোর্টের রায়, স্মারক ও নথি ইত্যাদিতে এদেশের আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া আছে। ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি, ১৯৯৫ সালের অর্থ আইন, আদালতের রায়, রাজস্ব বোর্ডের একাধিক স্মারক ও নথিতে ‘ইন্ডিজিনাস হিলম্যান’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। সরকার প্রধান থাকাকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তাঁদের বাণীতে এদেশের আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। মহাজোট সরকারের প্রধান শরীক দল আওয়ামী লীগসহ বেশ কয়েকটি দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ও গঠনতন্ত্রে ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার করেছে। এছাড়া ‘দারিদ্র বিমোচন কৌশল পত্র’, ২০০৯ সালের জাতীয় বাজেট ও জাতীয় শিড়্গানীতি-২০০৯ এ ‘আদিবাসী’ ও ‘ইন্ডিজিনাস পিপল’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। ১৯৫০ সালের ‘পূর্ববঙ্গ জমিদারী দখল ও প্রজাসত্ত্ব আইনে’ এদেশের আদিবাসীদেরকে ‘এবরোজিনাল কাস্ট এন্ড ট্রাইবস’ বলা হয়েছে। এই আইনটি সংবিধানে সন্নিবেশিত আছে। সর্বশেষ ২০১০ সালের ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনে’ও ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।

সুতরাং বাংলাদেশের আদিবাসীরা ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃত নেই- এ কথা বলার অবকাশ নেই। কারণ দেশের বহু আইন, পলিসি, নির্দেশনা ইত্যাদিতে এদেশের আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃত প্রদান করা আছে। দেশ বা রাষ্ট্রের যে কেউ যদি বলে- এদেশে কোন আদিবাসী নেই তা আইন লংঘন করার সামিল। কেউ যদি বলে অষ্ট্রেলিয়া বা আমেরিকার আদিবাসীরা যে অর্থে আদিবাসী এদেশের আদিবাসীরা সে অর্থে এদেশের আদিবাসী নয় তাই তাদের সংবিধানে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া যাবে না তা যেমনি আইনের লংঘন তেমনি অসত্য কথনও বটে। কারণ রাষ্ট্রের বিভিন্ন আইন বলছে এদেশের আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা আছে।

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নাগরিকের সাংবিধানিক স্বীকৃতির অধিকার- মানবাধিকার। এটি নাগরিকের একটি ন্যায্য ও গণতান্ত্রিক অধিকার। আদিবাসীরা এদেশের নাগরিক। এদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে আদিবাসীরা রক্ত দিয়েছে, জীবন দিয়েছে। সুতরাং এই আদিবাসীদের নিজের দেশের সংবিধানে স্বীকৃতি থাকবে না কেন?

এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ভারত, পাকিসত্মান, নেপাল, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, জাপান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশে আদিবাসীরা হয় সাংবিধানিকভাবে অথবা রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত। এশিয়ার এসব দেশে প্রথাগত ভ’মির অধিকারসহ আদিবাসীরা বহু পরিমানে রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করে থাকে।

 সাংবিধানিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে আদিবাসীদের মৌলিক অধিকারঃ

সরকারের তরফ থেকে আদিবাসী হিসেবে নয়, ড়্গুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হবে- এই ইস্যুকে নিয়ে বর্তমানে দেশের নাগরিক সমাজসহ আদিবাসীদের মধ্যে তুমুল আলোচনা এবং প্রতিবাদ-বিক্ষোভ-দাবীনামা চলছে। কিন্তু সংবিধানে আদিবাসীদের মৌলিক মানবাধিকার অধিকারগুলো কিভাবে স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে এবং কি মাত্রায় দেয়া হচ্ছে সে বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে খোলসা করে কোন কিছু বলা হচ্ছে না। সংবিধানে আদিবাসীদের জাতিগত পরিচিতি যেমন যথাযথভাবে স্বীকৃত হওয়া দরকার তেমনি আদিবাসীদের মৌলিক মানবাধিকারগুলোও যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গভাবে সংবিধানে স্বীকৃত হওয়া জরুরী। তাই আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে নাকি ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হবে কেবলমাত্র এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে যাতে আদিবাসীদের মৌলিক অধিকারগুলোর সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিষয়টা ধামাচাপা পড়ে না যায় সে বিষয়ে সকল মহলকে সতর্ক হতে হবে।

‘আদিবাসী’ শব্দটি সংবিধানের দু’একটি অনুচ্ছেদে সংযোজন করা হলো আর তার সাথে আদিবাসীদের দাবী অনুসারে একটি নতুন তফসিল সৃষ্টি করে তাতে আদিবাসী জাতিসমূহের নাম তালিকাভুক্ত করার মাধ্যমে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিষয়টি শেষ হয়ে যেতে পারে না। তার সাথে সাথে আদিবাসীদের মৌলিক মানবাধিকারগুলো যেমন- ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকার, প্রতিনিধিত্বের অধিকার (স্থানীয় সরকার পরিষদ ও জাতীয় সংসদে আদিবাসীদের জন্য আসন সংরক্ষণ), স্বশাসনের অধিকার (পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ শাসনব্যবস্থা), ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর অধিকার (প্রথাগত ভূমি অধিকার ও সমষ্টিগত মালিকানা), সিদ্ধান্ত-নির্ধারণের অধিকার (আদিবাসীদের মতামত ছাড়া আদিবাসী অধিকার সংক্রান্ত সাংবিধানিক অনুচ্ছেদ ও আইন সংশোধন না করা), সমান সুযোগ লাভ ও বৈষম্য থেকে মুক্তি লাভের অধিকার (শিক্ষা , চাকরি ইত্যাদির ক্ষেত্রে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ) ইত্যাদি অধিকারগুলো সংবিধানে স্বীকৃতি দিতে হবে।

বিশ্বস্তসূত্রে জানা গেছে যে, সরকার বা সংবিধান সংশোধন বিষয়ক বিশেষ সংসদীয় কমিটি কেবলমাত্র সংস্কৃতি সংক্রানত্ম কোন অনুচ্ছেদে ‘আদিবাসী’ (মতান্তরে ‘ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী’ বা ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী) শব্দটি সংযোজন/সন্নিবেশ করার মধ্য দিয়ে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিষয়টি বিবেচনা করছে। এই তথ্যটি যদি সঠিক হয় তাহলে সরকারের এই উদ্যোগ হবে একটি অর্থহীন, লোক দেখানো ও রাজনৈতিক অবিমৃষ্মকারিতা।

বলাবাহুল্য, কেবলমাত্র জাতিগত পরিচিতির স্বীকৃতির মাধ্যমে যেমনি আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিষয়টি হবে অর্থহীন ও লোকদেখানো; তেমনি যথাযথ জাতিগত পরিচিতির স্বীকৃতি ব্যতীত কেবলমাত্র আদিবাসীদের উল্লেখিত মৌলিক মানবাধিকারের স্বীকৃতিও হবে অপূর্ণাঙ্গ। তাই আদিবাসীদের আশা-আকাক্ষার ভিত্তিতে আদিবাসীদের যথাযথ জাতিগত পরিচিতির স্বীকৃতি এবং তার সাথে সাথে আদিবাসীদের উল্লেখিত মৌলিক মানবাধিকারগুলোও সংবিধানে সংযোজনের মাধ্যমে আদিবাসীদের অর্থবহ ও পূর্ণাঙ্গ সাংবিধানকি স্বীকৃতি প্রদানের জন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।

 আদিবাসী জাতিসমূহের অধিকার সাংবিধানিক স্বীকৃতির জন্য প্রস্তাবনাঃ

প্রথমত. বাংলাদেশ এক বহু জাতি, বহু ভাষা ও বহু ধর্মের দেশ। এই বিষয়টি বাংলাদেশের সংবিধানে সন্নিবেশ করা।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সংবিধানে তিন ধরণের মালিকানা- ১. রাষ্ট্রীয় মালিকানা, ২. সমবায় মালিকানা ও ৩. ব্যক্তি মালিকানার কথা উল্লেখ আছে। আদিবাসীদের ‘সমষ্টিগত মালিকানা’ সংবিধানে স্বীকৃত নয়। তাই সংবিধানে ‘সমষ্টিগত মালিকানা’ সন্নিবেশ করা।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশে বাঙালী ছাড়াও বহু আদিবাসী জাতি বাস করে। দেশের সমসত্ম আদিবাসী জাতিসমূহকে সংবিধানে স্বীকৃতি প্রদান করা।

চতুর্থত, সংবিধানে আদিবাসীদের প্রথাগত ভুমি অধিকার যথাযথভাবে স্বীকৃতি প্রদান করা।

পঞ্চমত, আদিবাসীদের ভাষা, সংস্কৃতি, প্রথা, ঐতিহ্য- এর সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা।

ষষ্ঠত, জাতীয় সংসদে আদিবাসীদের জন্য আসন সংরড়্গণের বিষয়টি সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা। প্রযোজ্যড়্গেত্রে স’ানীয় সরকার ব্যবস’ায় আসন সংরড়্গণের ব্যবস’া রাখা। আদিবাসীদের জন্য শিড়্গা, চাকরি, উন্নয়ন ইত্যাদি ড়্গেত্রে বিশেষ অধিকার প্রদানের বিষয়টিও সংবিধানে সন্নিবেশ করা। এসব ড়্গেত্রে আদিবাসী নারী ও অপেড়্গাকৃত অনগ্রসর আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ অধিকারের বিষয়টি সংবিধানে স্বীকৃতি প্রদান করা।

সপ্তমত, পার্বত্য চট্টগ্রামকে আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে বিশেষ শাসিত অঞ্চলের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা।

অষ্টমত, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ও এ চুক্তির আলোকে প্রণীত পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি- এর সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা।

নবমত, আদিবাসী বিষয়ক, সংবিধানের আদিবাসী অধিকার সংক্রানত্ম কোন অনুচ্ছেদ বা আদিবাসী বিষয়ক আইন প্রণয়ন, সংশোধন ও সংযোজন করতে গেলে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত অন্যান্য অঞ্চলের ড়্গেত্রে আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্বশীল নেতৃত্ব ও প্রতিষ্ঠানের সাথে আলোচনা পূর্বক পদক্ষেপ গ্রহণ করা- এই মর্মে সংবিধানে নতুন অনুচ্ছেদ সন্নিবেশ করা।

 

মহাজোট সরকারের জন্যও এ এক ঐতিহাসিক সুযোগ। একদিকে সংসদে দৃই-তৃতীয়াংশ সদস্য অপরদিকে হাইকোর্ট কর্তৃক পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের রায় বর্তমান সরকারকে সংবিধান সংশোধনের এক ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছে। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে চার মূলনীতি পুনস্থাপন করার যেমনি সুযোগ এনে দিয়েছে তেমনি সুযোগ এনে দিয়েছে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ তাদের প্রথাগত ভ’মির অধিকার, ভাষা, সংস্কৃতি ও স্বশাসন ব্যবস্থার স্বীকৃতির। আমাদের প্রত্যাশা মহাজোট সরকার এই ঐতিহাসিক সুযোগ হাতছাড়া করবে না।

 

লেখক: শক্তিপদ ত্রিপুরা, সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম

 

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com