হলুদ খামে কালো হৃদয় ।। আল মামুন খান

৭৩ বার পঠিত

বিবাহিত জীবনে বিচিত্র অনুভূতির ভিতর দিয়ে কুড়িটি বছর পার করেছে পারুল। সবাইকে সুন্দর ভাবে ‘ম্যানেজ’ করে চলছিল।
কিছু পাওয়া আর অনেক কিছু না পাওয়ার ভিতর দিয়ে বছর বছর বয়স বাড়ছিল। এক সময় সে খেয়াল করল, জীবন কাটাতে কাটাতে তার জীবনের প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে। মনে মনে তার জীবনের সাথে যুক্ত সবার কাছ থেকে, সব প্রয়োজন থেকে, নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে শুরু করেছে নিজেরই অজান্তে। জীবনের শুরু থেকে চারপাশের সবার অবিরাম প্রত্যাখ্যান- আর সেই প্রত্যাখান থেকে কৌশলে টিকে থাকার উপায় বের করতে করতে, সে চরম ক্লান্য হয়ে গিয়েছে। তার বিশ্রাম দরকার। তার আর কিছু চাইতে ইচ্ছে করছে না। সম্পর্কগুলি থেকে সন্তর্পণে সরে এসে নিজেকে ধ্বংস করে এক রকম নিষ্ঠুর প্রতিশোধের আনন্দ পাচ্ছে! সব বুঝে তার নিজেকে নিজের ভয় লাগছিল।
ভাবল, মৃত্যু বেশ কাছে চলে এসেছে।

মৃত্যুর ভাবনায় খুব অদ্ভুত একটা ব্যাপার হল। সবাই ছেড়ে যাওয়ার পর ‘কেউ কাছে আসছে’ – এই ব্যাপারটা নিয়ে সে এতটা অভিভূত হল, ‘কেউ’ টা যে মৃত্যু, তা সে খুব একটা অনুভব করল না। নি:সংগতা তার আর সহ্য হচ্ছিল না। এমন অবস্থায় সে তার বহু বছরের পুরানা এক বন্ধুকে ফিরে পেলো। অল্প বয়সের ঝগড়ার বন্ধু। এত বছর পর দেখা!
এর মধ্যে ‘জীবন গিয়াছে চলি কুড়ি কুড়ি বছরের পার…’

স্মৃতির দিনগুলি সময়ের হেরফেরে বদলে গেল। অল্প বয়সের স্মৃতি থেকে টুকরা টুকরা এটা সেটা তুলে আনতে আনতে, মধ্যবয়সের স্বভাব -অভাব-অভিযোগ-প্রয়োজন-অপ্রয়োজন বিনিময় হতে থাকল। তারা একসময় অনুভব করল, তাদের একের জীবনে অন্যের উপস্থিতিটা আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে!
প্রেম নয়- তার চেয়ে বেশী কিছু। গভীর একটা টান। একে অন্যের সব দু:খের দুখী হল তারা। পারুল নিরবে সব কষ্ট নিয়ে বন্ধুদের আসরে বসল। দু:খী বন্ধুকে আসরে ডাকল। বন্ধুদের সুখ থেকে ভাগ নেবে বলে। নিজেদের মধ্যে সুখ তৈরী করবে বলে। ওরা দেখল, ওরা সুখের কল্পনা করতে ভয় পাচ্ছে। সুখ তাদের সাথে সারাজীবন ছলনা করেছে। কষ্টকে বরং তারা বিশ্বাস করতে পারছিল।
এক সময় দু:খী বন্ধু জানালো, দুজনের মাঝখানে একটা সমান্তরাল রেললাইন আছে। সে কষ্ট পাচ্ছে। পারুল তার বন্ধুর এই কষ্টটাও বুক পেতে নিল। কিন্তু তার আর বইবার শক্তি রইল না। সে চলতে চলতে ভারসাম্য হারাতে লাগল। এরপর হয়ত একেবারেই পড়ে যেত- কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম, মৌসুম বদলায়।

একদিন যাদুর মত সব বদলে গেল। দুজনেরই পুরনো এক প্রিয় বন্ধু ফিরে এলো। আমান।
দুজনই সুখী হল। বন্ধুকে মাঝখানে রেখে তারা নিজেদের মধ্যে সুখ দু:খ লেনদেন করে চলল। পারুল তার নি:সংগ সময়ের আনাচ কানাচ ভরে সুখ নিতে থাকল। দু:খী বন্ধু তার গুছানো জীবন এলোমেলো হওয়ার ভয় থেকে মুক্ত হয়ে নিশ্চিন্ত হল। কিন্তু মনের অজান্তে নিজস্ব জগতে সে পারুলের জন্য একটা জায়গা করে দিয়েছিল, সেই জায়গাটাতে শুন্যতা এসে তাকে কষ্ট দিতে লাগল। পারুল ফিরল না। সে তার সুখী বন্ধুর সাথে সাথে ঘুরে ঘুরে সুখ ফেরি করতে শুরু করল। তারা দুজনে একটা সুখের গাছ লাগাল। তার শিকড়ে রইল স্বপ্নের মাটি আর দু:খধারা। গাছটি ‘জ্যাকের ম্যাজিক বীনের’ চারার ময়ি রাতাতাতি আকাশ ছুঁয়ে ফেলল। তা ফুলে ফলে ছেয়ে গেল।

ভাগ্যের পরিহাস! সুখী বন্ধুটা সুখ ছড়াচ্ছিল ঠিক, নিজে সেই সুখের একটা কণাও স্পর্শ করতে পারছিল না। সে সুখের ভান করতে শুরু করল। দিনে দিনে নিজের এই দৈন্যতা তাকে অস্থির করছিল। একদিন পারুল তার বন্ধুর এই অবস্থা দেখল। তার অপরাধবোধ হল। সে সুখের গাছটা পিছনে ফেলে একটা নির্জন পথ ধরে একা হাটতে শুরু করল। কেউ জজানল না। শুধু সেই একদা সুখী বন্ধু জানল। সে পারুলকে খুঁজতে থাকল। খুঁজেও পেল। তারপর সে দেখল, তার আর পারুলের মাঝখানে নদী হয়ে বয়ে যাচ্ছে সংসার-সমাজ-ধর্ম!

নদীর এক কূলে বসল বন্ধু, অন্য কূলে পারুল। নদী বইতে থাকল। তাদের মন সাঁতার দেয়, নদী পার হয়, তারা নিরবে বসে দেখে।

“নদীর কূল নাই, কিনার নাই রে… “

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com