সয়াবিন চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে লক্ষ্মীপুরের চাষীরা

৯৩ বার পঠিত

কিশোর কুমার দত্ত, লক্ষ্মীপুর: লক্ষ্মীপুর জেলা ‘সয়াবিনের রাজধানী’ বলে খ্যাত। দেশে উৎপাদিত সয়াবিনের ৮০ ভাগ চাষ হয় এ জেলায়। এবার এ ফসল ব্যাপক আকারে চাষ হলেও গেল বছরের তুলনায় কম। চলতি রবি মৌসুমে সয়াবিনের উৎপাদনের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৯৯ হাজার ৬৫৬ মেট্টিক টন। আর সয়াবিনের আবাদ করা হয়েছে ৫০ হাজার ৫০৫ হেক্টর জমিতে। যা গেল বছরের তুলনায় ২ হাজার ২১৫ হেক্টর কম। উপ-কৃষি কর্মকর্তারা পরামর্শ দিতে মাঠ পর্যায়ে তেমন না যাওয়ায় অনেকে এ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে বলে কৃষকদের অভিযোগ। তবে কৃষি অফিস বলছে, মাঠকর্মীরা পরামর্শ দিলেও অনিয়মতান্ত্রিক চাষের কারণে কিছু কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এবার ওই কৃষকরা ফসল পরিবর্তন করে বাদাম চাষাবাদ করেছেন। তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে পরমর্শ অনুযায়ী সয়াবিন চাষে এবারও বাম্পার ফলনের আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১৯৮২ সালে মেনোনাইট সেন্ট্রাল কমিটি (এমসিসি) নামের একটি সংস্থা সর্বপ্রথম লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার হায়দারগঞ্জে পরীক্ষামূলক ভাবে সয়াবিনের চাষ করে। পরীক্ষামূলক চাষেই সয়াবিন উৎপাদনের সাফলতা আসে। খরচের তুলনায় লাভ বেশি হওয়ায় দিন দিন সয়বিন চাষে আগ্রহ বাড়ছে এ অঞ্চলের চাষীদের। চলতি রবি মৌসুমে জেলায় ৫২ হাজার ৭২৮ হেক্টর জমিতে সয়াবিন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৯৯ হাজার ৬৫৬ মেট্টিক টন। গেল বছর ৫২ হাজার ৭২০ হেক্টর জমিতে সয়াবিনের আবাদ হয়েছিল। তবে চলতি বছর আবাদ হয়েছে ৫০ হাজার ৫০৫ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে রামগতিতে ১৮ হাজার ২০০ হেক্টর, কমলনগরে ১৬ হাজার ৩১০ হেক্টর, সদরে ৭ হাজার ৯৫০ হেক্টর, রায়পুরে ৭ হাজার ৯৬০ হেক্টর ও রামগঞ্জ উপজেলায় ৮৫ হেক্টর।

প্রতি একর সয়াবিন উৎপাদনে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। যার বিক্রয় মূল্য ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। এ ফসল জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় রপ্তানি করা হয়। জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বির্স্তৃন মাঠ জুড়ে সবুজ আবরনে ঘিরে রয়েছে সয়াবিনের ক্ষেত। ফাল্গুনের দক্ষিণা হাওয়ায় দুলছে সয়াবিন গাছে। অনেকাংশের গাছগুলোতে সয়াবিনের ফুল ও সয়াবিন আসতে শুরু করেছে। আর পোকা মাকড় থেকে রক্ষার কিটণাশক ওষধ ব্যবহার করছে চাষীরা। বতর্মানে সয়াবিন ক্ষেতগুলোতে আগাছা দমনে পরিচর্যার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন এখানকার কৃষাণ-কৃষাণীরা।

কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সয়াবিন চাষে কৃষকদের সময় লাগে তিন থেকে ৪ মাস। আমন ধান কাটার পরপর মাঘ মাসের প্রথম সপ্তাহে জমিতে নিরানী দিয়ে মাটি শুকিয়ে ঝরঝরে করে জৈব ও রাসানিক সার প্রয়োগের মাধ্যমে সয়াবিনের চাষের জন্য প্রস্তুত করা হয়। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে সয়াবিনের বীজ বুনন করে কৃষকরা। বীজ থেকে চারা গজানোর একমাসের মাথায় তারা আগাছা দমনে পরি”র্যার কাজ করে থাকে।

অধিকাংশ কৃষক অভিযোগ করে জানায়, সয়াবিন আবাদে কম খরচে অধিক লাভবান হওয়া যায়। কিন্তু কৃষি কর্মকর্তাদের উদাসিনতার কারণে দিন দিন সয়াবিন আবাদে তারা আগ্রহ হারাচ্ছেন। তাদের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবী এ জেলায় যদি প্রক্রিয়াজাত করণ কারখানা স্থাপন করা হতো ন্যায্যমূলের পাশাপাশি আরো লাভবান হতো তারা। এতে কর্ম সংস্থানের সুযোগ পেত এ অঞ্চলের বেকার যুবকরা। কৃষক রুহুল আমিন বলেন, গত বছর এক একর জমিতে সয়াবিনের আবাদ করে ১০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। কেউ কোন পরামর্শ দিতেও আসেনি। তাই এবার ওই জমিতে বাদামের আবাদ বাদাম করছেন তিনি। ভালো ফলন হবে বলে আশা করেন তিনি।

চরমনসা গ্রামের কৃষক সালাহ উদ্দিন মোল্লা জানান, গত বছর ৩০ হাজার টাকা ব্যয়ে দু’একর জমিতে চাষাবাদ করে ৫৫ মন সয়াবিন উৎপাদন হয়েছে। এতে তার ৬৬ হাজার টাকা লাভবান হয়েছেন। এবার স্থানীয় ভাবে কিছু ঋণ করে তিনি দুই কানি জমিতে আবারও সয়াবিনের আবাদ করেছেন। তিনি সয়াবিনে বাম্পার ফলনের আশাবাদী। তিনি বলেন, বাড়িতে মেশিনে সয়াবিন তোলতে প্রতি মণে তিন কেজি সয়াবিন দিতে হয়। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়।

লক্ষ্মীপুরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবুল হোসেন জানান, বীজ বপনের ৯৫ থেকে ১১৫ দিনের মধ্যে সয়াবিন ঘরে তোলা যায়। এ গাছ ৩০ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার উঁচু হয়ে থাকে। সয়াবিন ভোজ্য তেলের প্রধান উৎস। হেক্টর প্রতি ১.৮৯ মেট্রিক টন উৎপাদন হয়ে থাকে। লক্ষ্মীপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ গোলাম মোস্তফা অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি জানান, ভালো ফলন পেতে কৃষি অফিস ও উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠে গিয়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে আসছেন। এ বছর জেলার কিছু কৃষক বাদাম চাষের দিকে ঝুকছে। তাই ২ হাজার ২১৫ হেক্টর কম জমিতে সয়াবিনের আবাদ হয়েছে।

তিনি আরো জানান, এ সয়াবিন থেকে পুষ্টিকর খাবার সয়াদুধ, সয়ানাগের ও সয়াতপুসহ বিভিন্ন খাদ্য তৈরি হয়। সয়াবিন প্রক্রিয়াজাত করণ কারখানার ব্যবস্থা করা হলে যেমন কর্মস্থানের সুযোগ হতো, তেমনি চাষীরা ন্যায্য মূল্য পেতো বলে জানান এ কৃষিবিদ।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কিশোর কুমার দত্ত, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি #

কিশোর কুমার দত্ত, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি। মোবাইলঃ 01714-953963, ইমেইলঃ kkumar3700@gmail.com

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com