স্টিং অপারেশন, না ষড়যন্ত্র? কিছু প্রশ্ন

সুকুমার মিত্র, কলকাতা # নারদ নিউজ-এর সাংবাদিক ম্যাথু স্যামুয়েলস যেটি করেছেন তাকে আমি ‘স্টিং অপারেশন’ বলতে পারছি না। দুই বা একাধিক পক্ষ‌ কোনও ‘অবৈধ লেনদেন’ বা ‘অপারেশন’কে একজন সাংবাদিক যদি ক্যামেরা বন্দী করে জনসমক্ষেদ সেই দুর্নীতি তুলে ধরেন সেটাকেই ‘স্টিং অপারেশন’ বলা যেতে পারে। সাংবাদিক নিজে যখন টাকা তুলে দিয়ে কোনও বা একদল নেতা, মন্ত্রীকে ‘টোপ’ দিয়ে টাকা তুলে দেন তাকে ষড়যন্ত্র ছাড়া আরা কিছুই বলা উচিত না।

এই ব্যাপারে বাংলার সাংবাদিক মহল যাঁরা ‘দিদি’র কাছাকাছি থাকেন বা থাকার আপ্রাণ চেষ্টা চালান তাঁরা সেটা নৈতিকতার দিক থেকে প্রতিবাদ করার প্রয়োজন বোধ করছেন না। সংঘ পরিবারের নির্দেশে তৃণমূল কংগ্রেস-এর একজন সাংসদের ৮০ লক্ষ‌ টাকায় যখন এটি করেন তা ষড়যন্ত্র ছাড়া আরা কিছুই নয়, অন্তত আমি এটাই বুঝি। কে এই কে. ডি. সিং যিনি অ্যালকেমিস্ট নামে একটি নন ব্যাঙ্কিং কোম্পানি করে কোটি কোটি টাকা বাজার থেকে আমানত হিসেবে তুলে তা আমানতকারীকে মেয়াদান্তে ফিরিয়ে দিচ্ছেন না।

তিনি সিবিআই-এর হাত থেকে বাঁচার জন্য নারদ স্টিং অপারেশনে যে ৮০ লক্ষ‌ টাকা দিয়েছেন তাঁর আইনি বৈধতা আয়কর দপ্তর, স্বরাষ্ট্র দপ্তর, ই.ডি বা সিবিআই খতিয়ে দেখবে তো? সারদা কর্তা, রোজ ভ্যালির কর্তার মত কে.ডি. সিং –এর একই পরিণতি কে দেশবাসী দেখতে পারবেন? উত্তর না। পারবেন না কারণ এটাই এই ষড়যন্ত্রে অর্থ বিনিয়োগের অলিখিত প্রাক শর্ত। এই প্রসঙ্গে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেবত্রে সাংবাদিকতার, সাংবাদিকদের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন দাঁড় করিয়ে দিয়েছে ‘নারদ স্টিং অপারেশন।’

প্রসঙ্গত, স্টিং অপারেশন যা আন্ডারকভার অপারেশন নামেও পরিচিত মূলত ‘ছদ্মবেশী’ বা ‘ফাঁদ পাতা’র মতো প্রতারণামূলক একটি কৌশল যার মাধ্যমে ফাঁদে ফেলে অপরাধ করতে সহযোগিতা দিয়ে অপকর্মের ঠিক আগ মুহূর্তে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ধরে ফেলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশে এ ধরনের অভিযান প্রচলিত থাকলেও এর নৈতিক ও আইনি দিক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।সুইডেন, নেদারল্যান্ডসের মতো কয়েকটি দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্টিং অপারেশন নিষিদ্ধ। স্টিং অপারেশনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা কখনও মাদক বা অস্ত্রের ক্রেতা সেজে মাদক ও অস্ত্র বিক্রেতাকে ফাঁদে ফেলেন।

নৈতিকতা ইস্যুতে আলোচনা-সমালোচনা যা-ই থাকুক না কেন, অনেক দেশেই এটি বৈধ প্রক্রিয়া। তবে অপরাধ সংঘটনে কাউকে উদ্বুদ্ধ করার বিষয়ে আইনী প্রক্রিয়া দেশে দেশে ভিন্ন। স্টিং অপারেশনের পিছনে রাজনৈতিক নেতার অর্থ বিনিয়োগ ইঙ্গিত করে এটি একটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিচারাধীন বিষয় নিয়ে মন্তব্য করছেন অনেকে। কার কবে জেল হবে, কে কবে গ্রেফতার হবে সবই প্রকাশ্যে বলা হচ্ছে। আর সেই অনুযায়ী কাজও এগোচ্ছে। এই সব কিসের ইংগিত বহন করে? আইন, আদালতে এই নারদ অপারেশন-এর ভবিষ্যত কি তা বলা সম্ভব না। তবে সাংবাদিকদের নৈতিকতা ও সততার প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িত।

একজন সাংসদ যিনি দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত তার অর্থ নিয়ে এই অপারেশন যে দুর্নীতি উন্মোচন করার জন্য হয়েছে তা নয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবেই করা হয়েছে। তাই ২০১৪ সালে করা হলেও ২০১৬-র বিধানসভা নির্বাচনের মুখে কেন তা বিজেপি পার্টি অফিস থেকে রিলিজ করা হল? এসব প্রশ্নের উত্তর আদালতে দিতে হবে। ভারতীয় আইন ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা রয়েছে। চমক, ধমক দিয়ে সবটা উতরানো যাবে না। নারদ স্টিং অপারেশনের পরিণতি দেখবার জন্য আমাদের অপেক্ষাা করতে হবে আরও কিছু কাল।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •