বেকারত্ব : যুবকদের কর্মসংস্থান নেই কেন ?

এম নজরুল ইসলাম :

দেশের জনসংখ্যা বাড়লেও সেই অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে না। ফলে লাখ লাখ নয় দেশে বেকারের সংখ্যা এখন কোটি কোটি। সংজ্ঞা নিয়ে জটিলতায় সত্যিকারের বেকার হয়েও বেকারের তালিকার বাইরে আছে দেশের ৪৬ লাখ মানুষ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে

লেখক : সাংবাদিক নজরুল ইসলাম

তাদের বেকার হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। যদিও এই ৪৬ লাখ শ্রমশক্তিকে কর্মক্ষম হিসেবে ধরছে বিবিএস। বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে পাল্লা দিয়ে বেকারের সংখ্যা বাড়লেও বিদ্যমান যুব সংগঠনগুলো সমস্যা সমাধানে কোনো ভূমিকা রাখছে না। সেক্ষেত্রে সরকারি আর বিরোধী সব যুব সংগঠনই নানা রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে তাদের কর্মকা- সীমাবদ্ধ রেখেছে। বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে সরকারকে বাধ্য করার জোরালো কোন কর্মসূচি তাদের নেই। ফলে সারাদেশে অশিক্ষিত বেকারের পাশাপাশি হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) বিদ্যমান সংজ্ঞা অনুযায়ী, ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে কোনো ব্যক্তি সপ্তাহে এক ঘণ্টার জন্য হলেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিলে তাকে কর্মক্ষম ধরা হয়। আর ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে কোনো ব্যক্তি যদি সপ্তাহে এক ঘণ্টাও কাজ না করে থাকে এবং এক মাসে খুঁজেও কাজ না পেলে সে ক্ষেত্রে তাকে বেকার হিসেবে গণ্য করা হয়। বিবিএসের সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ বলছে, এই হিসাবে দেশে এখন বেকারের সংখ্যা মাত্র ২৬ লাখ। যদিও আইএলওর সংজ্ঞা ব্যবহার করেই জরিপ চালিয়ে থাকে বিবিএস।

বিবিএসের সর্বশেষ তথ্য বলছে, বর্তমান শ্রমবাজারে কাজ দিতে প্রস্তুত নয় বা নিজের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও কাজ পাচ্ছে না, এমন সংখ্যা ২৮ লাখ। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কাজ করার সক্ষমতা আছে। যেকোনো কাজ পেলে তারা করত। কিন্তু কাজ করেনি অথবা কাজ খোঁজেনি, এমন শ্রমশক্তি ২৮ লাখ। পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজ করছে, এমন লোকের সংখ্যা ১৮ লাখ। খণ্ডকালীন বলতে টিউশনি, গবেষণার কাজ, জরিপের কাজসহ অন্যান্য কাজকে ধরা হয়েছে। বিবিএসের কর্মকর্তারা বলছেন, এই দুই শ্রেণিতে যারা আছে, তারা বিদ্যমান আইএলওর সংজ্ঞা অনুযায়ী বেকার নয়। শ্রমশক্তিতে অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এরা বেকার। কারণ, বাংলাদেশে খণ্ডকালীন কাজকে চাকরি হিসেবে গণ্য করা হয় না।

প্রকল্প পরিচালক কবির উদ্দিন আহমেদ জানান, এ জরিপে সপ্তাহে এক ঘণ্টা কেউ কাজ করলে তাকে বেকার হিসেবে ধরা হয়নি। বলা হয়েছে, ১৫ বছরের ওপরের বয়সীদের মধ্যে পুরোপুরি বেকার ২৬ লাখ হলেও যারা কাজ করতে চায় বা এক মাসের মধ্যে কাজের খোঁজ করেছিল কিন্তু পায়নি এ রকম মানুষের সংখ্যা ২৮ লাখ। সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টার চেয়ে কম কাজ করে, এমন খণ্ডকালীন কর্মে আছে ১৮ লাখ মানুষ। আর বেকার আছে ২৬ লাখ। সব মিলিয়ে ধরা হলে বেকারের সংখ্যা দঁাড়ায় ৭২ লাখে। বর্তমানে দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ১০ কোটি ৬০ লাখ। এর মধ্যে শ্রমশক্তিতে আছে ছয় কোটি ২১ লাখ।  

অতিরিক্ত সচিব জাকির হোসেন বলেন, আগে আমিও ভাবতাম এত কম বেকার কিভাবে সম্ভব। কিন্তু এখানে এসে বুঝতে পারি, আইএলওর সংজ্ঞা অনুযায়ী যারা দিনে এক ঘণ্টা কাজ করে বা নিজের জন্য কোনো কিছু উত্পাদন করে তাদের বেকারের হিসাবে ধরা হয় না।

সম্প্রতি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী সংসদে বলেছেন, দেশে বর্তমানে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ।

২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি তৎকালীন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন সংসদে জানিয়েছিলেন, দেশে বেকার জনসংখ্যা ২১ লাখ। সব মিলিয়ে সরকারি হিসাবে তিন বছরে দেশে কাজ নেই এমন লোকের সংখ্যা বেড়েছে ছয় লাখ।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী ২০১০ সালে পরিসংখ্যান অধিদপ্তরের জরিপের ফলাফল তুলে ধরে বলেন, দেশে বর্তমানে মোট শ্রমশক্তির সংখ্যা ৫ কোটি ৭২ লাখ। এর মধ্যে কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত শ্রমশক্তির সংখ্যা ৫ কোটি ৪৫ লাখ। বাকি ২৭ লাখ কর্মক্ষম লোক বর্তমানে বেকার রয়েছেন।
তবে জেলা পরিসংখ্যান অফিস থেকে জেলার বর্তমান বেকারের সংখ্যা জানা সম্ভব হয়নি।

জেলার বিভিন্ন যুব সংগঠনের নেতারা অবশ্য এই পরিসংখ্যান নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। প্রত্যেকেই তাদের স্ব স্ব রাজনৈতিক দলের অবস্থান থেকে বক্তব্য দিয়েছেন। তবে তাদের বক্তব্যে এটা পরিস্কার তারা কেউ নিজেদের অবস্থান থেকে বেকারদের কর্মসংস্থানের জন্য জোরালো কোনো উদ্যোগ নেননি।

যুব সংগঠনের নেতারা দাবি করেছেন, পরিসংখ্যান থেকে বেকারের সংখ্যা বর্তমানে অনেক কম। বর্তমান সরকার বেকারদের কর্মসংস্থানের জন্য নানামুখি উদ্যোগ নেওয়ার কারণে কাজ নেই এমন মানুষের সংখ্যা এখন নেই বললেই চলে। সরকার বেকারদের যুব উন্নয়ন থেকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। তাদের কম সুদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ফলে দেশের যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ হচ্ছে। সরকারের বাইরে যুব সংগঠন থেকে বেকার সমস্যা সমাধানের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

অভিজ্ঞদের মতে মূল কথা হলো– সরকার ঘরে ঘরে চাকরি দিতে চেয়েছিলো। কিন্তু বাস্তবে তা, না’ দিয়ে দেশে বেকারের সংখ্যা বাড়িয়েছে। সারাদেশের বেকারদের যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়েছে বাস্তবের সাথে তার কোনো মিল নেই। সত্য ঢাকতে পরিসংখ্যানে বেকারের সংখ্যা কম দেখাচ্ছে। দেশে বিনিয়োগের অভাবে বেকারদের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। অনেক সরকারি কারখানা বন্ধ করে হাজার হাজার কর্মী বেকার করা হয়েছে। এছাড়া প্রতি বছর লাখ লাখ যুবক বেকারের খাতায় নাম লেখাচ্ছে বলে অভিজ্ঞরা মতামত দিয়েছেন

কর্মসংস্থানের নামে সরকার যা করছে তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দলীয় লোকদের আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার মতো। একটি বাড়ি একটি খামার, ব্যাংক ঋণসহ কর্মসংস্থান সৃষ্টি সংক্রান্ত সব কর্মসূচিতে প্রকৃত বেকার বঞ্চিত হচ্ছেন। প্রকৃত বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান নেই কেন ?

 

 

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক কর্মী (জাপা)

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
২০৪ বার পঠিত

স্টাফ রিপোর্টার

Nazrul Journalist Bogra

Leave a Reply