সাংবাদিকদের লেখালেখি, সাংবাদিকদের পড়াশোনা

৩১ বার পঠিত

১. প্রমথনাথ বিশী শান্তিনিকেতনে পড়তেন। অঙ্কে ভালো ছিলেন না। একবার পরীক্ষার খাতায় লিখে দিলেন,
হে হরি হে দয়াময়,
কিছু মার্ক দিয়ো আমায়।
তোমার শরণাগত
নহি সতত
শুধু এই পরীক্ষার সময়।
অঙ্ক করাতেন নগেন আইচ। তিনি খাতাটা নিয়ে গেলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে। রবীন্দ্রনাথ কবিতাটি পড়ে বললেন, উদ্যত অঙ্কপত্রের সামনে কজন প্রবীণ কবি এমন কবিতা লিখতে পারে! ওকে অঙ্ক কষাতে চেষ্টা কর, তবে কবিতা লেখায় বাধা দিয়ো না।
এই প্রমথনাথ বিশী বড় হয়ে লিখলেন ‘রবীন্দ্র-কাব্য প্রবাহ’। তাতে একটি অধ্যায় আছে-রবীন্দ্রনাথের দোষ: অতিকথন ও সামান্যকথন।বাঙালি মাত্রই সমালোচনা সহ্য করতে পারে না। রবীন্দ্রনাথও পারেননি। তিনি এতটাই উত্তেজিত হয়েছিলেন যে প্রমথ নাথের একটি উপন্যাসের পাতায় মার্জিনে মার্জিনে লিখেছিলে, ইহা কি অতিকথন নয়? ইহা কি সামান্যকথন নয়?
প্রমথনাথ বিশী আনন্দবাজারে বেশ কিছুদিন সাংবাদিকতাও করেছিলেন। চার বছর সহকারী সম্পাদক ছিলেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান। সেখানে তিনি বাংলার অধ্যাপক হলেন। একবার এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘মূর্খের পাণ্ডিত্য ও পণ্ডিতের মূর্খতা দেখেছি দুই জায়গায়। সংবাদপত্রের জগতে দেখেছি মূর্খের পাণ্ডিত্য, কিছু না পড়েও তারা সব জানে, সবজান্তার দল। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখেছি পণ্ডিতের মূর্খতা।’
প্রমথনাথ বিশীর লাল কেল্লা নামের খুব বিখ্যাত একটা উপন্যাসও আছে। সুতরাং সাহিত্য নিয়েও কিন্তু বলেছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘না ভাবিয়া লিখিলে জার্নালিজম, ভাবিয়া লিখিলে সাহিত্য।’
২.
তবে সাংবাদিকেরা পণ্ডিত হবেন এমনটি কোথাও লেখা নেই। তাহলে তো আমরা সাংবাদিক হতাম না, অধ্যাপকই হতাম। তবে এটা সত্যি যে সাংবাদিক একবার হয়ে গেলে পড়ার কোনো বিকল্প নেই। রওশন এরশাদের কথা মেনে নিলাম না হয়।কিন্তু যেভাবেই হোক, একবার সাংবাদিকতার চাকরি শুরু করলে এরপর পড়ার কোনো বিকল্প নেই। তা না হলে শেষ বিচারে প্রমথনাথ বিশীই সত্যি হয়ে থাকবেন।
অনেকেই প্রশ্ন করেন কি পড়বেন? উত্তর একটাই। সবকিছু।শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় তাঁর কিশোর উপন্যাস সমগ্রের ভূমিকায় লিখেছেন, ‘মাতৃভাষা না-জানাটা বা সাহিত্য না-পড়াটা মানুষের মেধার সর্বাঙ্গীণ বিকাশের পক্ষেও সহায়ক নয়।’ আসলে কেবল সাংবাদিক কেনো, পড়াটা সবার জন্যই।
৩.
সাংবাদিকতা করি অনেক দিন। সুতরাং নিজের এবং অপরের অর্থাৎ মূর্খের পাণ্ডিত্য দেখছি অনেক দিন। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিতে গিয়েছিলাম। ভাবলাম এবার আমি তাহলে পণ্ডিতের মূর্খতা দেখানোর দলে চলে আসলাম। কিন্তু পোড়া কপাল, এখানেও আমি সেই মূর্খের পাণ্ডিত্য দেখানোর দলেই থেকে গেলাম।
সবাই যে আমার দলে তা নয়। অনেকেই লেখাপড়া করেন, অসম্ভব ভালো লেখেনও। মূর্খ থেকে গেলাম আমি ও আমাদের কেউ কেউ। সাংবাদিকের লেখা তিনটি বই পড়া হলো পরপর। একটি হচ্ছে আনন্দবাজারের রিপোর্টার সুখরঞ্জন দাশগুপ্তের একাল-সেকাল। আরেকটি হলো পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ডেটলাইন ঢাকা এবং হামদি বে এর বে অফ বেঙ্গল।
একাল-সেকাল মূলত সুখরঞ্জন দাশগুপ্তের সাংবাদিক জীবন নিয়ে লেখা। রিপোর্টের মতো করেই লেখা, এর ভাষা বা শিল্পমূল্য নিয়ে আলোচনার কিছু নেই। তবে ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির একটি ধারাবাহিক চিত্র পাওয়া যায়। অনেক মজার তথ্য, ঘটনা ও সংবাদের পেছনের খবর জানতে পারা যায়। জরুরি অবস্থার সময়কার পরিস্থিতির যে বর্ণনা তা থেকেও শেখার আছে অনেক কিছু। যারা সাংবাদিকতা করেন বা সাংবাদিকতা নিয়ে আগ্রহ আছে তারা পড়তে পারেন।
পার্থ চট্টোপাধ্যায় ১৯৭১ সালে আনন্দবাজারে ওয়্যার করসপনডেন্ট ছিলেন। যুদ্ধের সময় বাংলাদেশে ছিলেন, অনেক কিছুই দেখেছেন। সুতরাং এই বইটির আবেদন একদমই অন্যরকম। পথে পথে দেখা অনেক কিছুরই বিবরণ আছে এখানে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে আত্মসমর্পণের ঠিক পর পর তিনি ছিলেন সে সময়ের হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টাল হোটেলে। হোটেলটি ছিল রেডক্রসের অধীনে। মালেক মন্ত্রিসভার অনেকেই আশ্রয় নিয়েছিলেন সেখানে। ছিল কূটনীতিকেরাও। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা অন্য কেউ লিখেছেন কিনা আমার জানা নেই।সেই অর্থে বিশেষ একটি গ্রন্থ ডেটলাইন ঢাকা।
তবে ভাষা বা শিল্পগুণ-দুই দিক থেকেই মনে রাখার মতো বই হচ্ছে হামদি বে-এর বইটি। কি এই হামদি বে? কেউ কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন। কালি ও কলম-এ হাসনাত ভাই (আবুল হাসনাত) হামদি বে নিয়ে একটি মনোগ্রাহি লেখা লিখেছিলেন। সেখান থেকে কিছু উল্লেখ করি।
‘উর্দুভাষী এই মানুষটির জন্ম হয়েছিল ১৯১৫ সালে বিহারের ছাপড়ায়। বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন পাটনা কলেজে। সাংবাদিকতায় হাতে খড়ি হয় রয়টারে। দেশ বিভাজনের পর অভিভাবকেরা চলে গেলেন পাকিস্তানে। তিনি থেকে গেলেন ভারতে। তিনি রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং অভিজ্ঞতায় উপলব্ধি করেছিলেন কোনো সৃজনশীল, ধর্মনিরপেক্ষ, ঔদার্যগুণসম্পন্ন মানুষের জন্য পাকিস্তান আদর্শ রাষ্ট্র নয়, পাকিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতা কোনো উদারনৈতিক ভাবের জন্ম দেবে না। তিনি চল্লিশের দশকে সেই বিহার থেকে এই মনোভঙ্গি ধারণ করে যে শিকড়হীন হলেন তার জন্য কোনোদিন অনুতাপ করেননি। কলকাতা তাঁকে যে নির্ভরতা, প্রশান্তি ও বন্ধুবৃত্ত দিয়েছিল, তা হয়ে উঠেছিল তাঁর বেঁচে থাকার জন্য পরম সহায়।……….গড়পড়তা মানুষের বাইরে এবং মনেপ্রাণে সাহিত্য-অন্তপ্রাণ হামদি বে। কিন্তু মূলত ডাকসাইটে এক সাংবাদিক, ইংরেজি সাংবাদিকতায় কত না তাঁর অর্জন! স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতবর্ষের সর্বাধিক খ্যাতিমান ও আলোচিত দুই সংবাদপত্র টাইমস অব ইন্ডিয়া আর দ্য স্টেটসম্যানে কাজ করেছেন। পরবর্তীকালে কাজ করেছেন বাংলা দৈনিক আজকালে।’
আজকালে কাজ করলেও তিনি লিখতেন ইংরেজিতে। সেগুলো অনুবাদ করে প্রকাশ করা হতো। তাঁর মোট ৬৬টি লেখা নিয়ে বই ‘বে অফ বেঙ্গল’। তিনি কি নিয়ে লিখেছেন তা বলার চেয়ে বরং বলা যায় কি নিয়ে লেখেননি।বইটির ভূমিকায় তিনি নিজে লিখেছেন কীভাবে গৌরকিশোর ঘোষ তাঁকে আজকালে নিয়ে এসেছিলেন। বলেছেন তিনি সে সময়ে একটিই বাংলা ছড়া জানতেন।
‘গৌরকিশোর ঘোষ
পোষে বুনো মোষ’
বলাই বাহুল্য এই বুনো মোষ হামতি বে নিজেই। যদিও হামদি বে লিখেছেন, ‘আমার জন্ম বিহারে, ভাষা ইংরেজি, আর ভালোবাসা বাংলা’।

পানীয়র প্রতি হামদি বে-এর আসক্তি কিংবদন্তি পর্যায়ে ছিল। হাসনাত ভাই যেমনটি লিখেছেন, ‘সেদিনের আড্ডায় কে যেন বলছিলেন মধ্যাহ্নে তাঁর পানাসক্তির কথা। নিয়মিত যান একটি পানশালায়। কোনোদিন পা টলেনি, মননে চিড় ধরেনি, চিন্তা এতটুকুও এলোমেলো হয়নি।’ তিনি নিজেও একাধিক লেখায় পানীয়র প্রতি তাঁর আসক্তির কথা অকপটে লিখেছেন।মজার ব্যাপার হলো মদ্যপান বিরোধী সভার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়েই প্রথম তাঁর মদ্যপান। সে এক দারুণ গল্প।
বইটির সেরা লেখা কোনটি? আমার কাছে, ‘প্রাণীদের মধ্যে সুন্দরীতম কে? হিংস্রতম কে?’ শুরুটা এ রকম-‘প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর কোন প্রজাতি? মানুষ পোশাকে সুন্দর, কিন্তু নগ্ন অবস্থায় নূরজাহান কি হেলেনের চাইতেও আমি একটি বাঘিনীকে সুন্দর বলে মানি। তার চলন নিঃশব্দ ও ঢেউখেলানো। সে যদি একবারও কারও দিকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকায় সেই গভীর, নিশ্চল, হিমশীতল দৃষ্টি ভোলা যায় না।’ ছোট্ট এই লেখাটি শেষ লাইনে এসে ধাক্কা দিয়ে বলবে-কে বেশি সুন্দরী, কে বেশি হিংস্র।
বুদ্ধদেব বসুর কন্যা মিনাক্ষী দত্তের অনুবাদের এই বইটি অবশ্য পাঠ্য। সাংবাদিকদের জন্যই নয় কেবল, সবার জন্য।
৪.
সবশেষে ডা. বিধান চন্দ্র রায়ের গল্পটা বলি। পেয়েছি সুখরঞ্জন দাশগুপ্তের বইটি থেকে। ১৯৪৮ থেকে ৬২ পর্যন্ত পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। স্বাধীনতার ঠিক পরে কেন্দ্রীয় নেহরু সরকার সিদ্ধান্ত নিল পুরো ভারতে সোভিয়েত, ব্রিটিশ ও জার্মানির সহযোগিতায় ৮টি বড় ইস্পাত কারখানা হবে। কিন্তু তালিকায় পশ্চিমবঙ্গ নেই। এ নিয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে বিরোধ দেখা দিল। কারণ, বিধান চন্দ্র রায়ের একটি কারখানা চাই পশ্চিম বঙ্গের দুর্গাপুরে। কিন্তু কেন্দ্রের যুক্তি হচ্ছে দুর্গাপুর সে সময়ের পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্তের ১০০ মাইলের মধ্যে। ফলে যুদ্ধ বাধলে লক্ষ্যে পরিণত হবে কারখানাটি।এটাই ছিল গোয়েন্দা রিপোর্টের তথ্য। কিন্তু মানলেন না বিধান চন্দ্র রায়।প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুও সিদ্ধান্তে অটল।
তারপর একদিন মুখ্যমন্ত্রী দুই জনপ্রিয় পত্রিকা আনন্দবাজার পত্রিকার চিফ রিপোর্টার শিবদাস চক্রবর্তী ও যুগান্তরের চিফ রিপোর্টার অনিল ভট্টাচার্যকে ডাকলেন। বললেন, তাঁরা জেনো প্রতিনিয়ত লিখে লিখে দুর্গাপুরে ইস্পাত কারখানা তৈরির পক্ষে জনমত গড়ে তোলেন। তারপর ওই পত্রিকায় ছাপা হতে লাগলে এ নিয়ে অসংখ্য রিপোর্ট।
সে সময়ের কংগ্রেস সরকারের কেন্দ্রীয় শিল্পমন্ত্রী ছিলেন ওডিশার নিত্যানন্দ কানুনগো।ইস্পাত কারখানা প্রকল্প তারই অধীনে। একদিন বিধান চন্দ্র রায়কে যেতে হলো জাতীয় উন্নয়ন পর্ষদের বৈঠকে। সভা চলার সময়ে হঠাৎ দেখলেন শিল্পমন্ত্রী অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছেন। বিধান চন্দ্র নিজেই একজন বড় চিকিৎসক। শিল্পমন্ত্রীকে নিয়ে যাওয়া হলো হাসপাতালে। পরীক্ষা করে ডা. বিধান চন্দ্র বললেন পরদিনই অপারেশন করতে হবে এবং সেটা তিনিই করবেন। পেটের ভেতরে পাথর জমা হয়ে জটিল আকার নিয়েছে। তখন এই চিকিৎসা এখনকার মতো এত সহজ ছিল না। নিত্যানন্দ কানুনগো বিদেশে চিকিৎসা করিয়েও ফল পাননি।কিন্তু বিধান চন্দ্রের চিকিৎসায় ভালো হয়ে গেলেন।
একদিন বিধান চন্দ্র রায় গেলেন রোগী দেখতে। শিল্পমন্ত্রী ডা. রায়ের হাত ধরে বললেন, ‘আপনি আমার জীবন ফিরিয়ে দিলেন। কিন্তু কোনো ফি নিলেন না।’ বিধান চন্দ্র রায় একটু হেসে বলেছিলেন, ‘আমার ফি যদি দিতে চাও তাহলে দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানার ছাড়পত্র দিয়ে দিয়ো।’
ফি দিয়েছিলেন নিত্যানন্দ কানুনগো। নেহরুর সঙ্গে লড়াই করে ঠিকই সম্মতি আদায় করলেন। তারপর এত দিন অনুমোদনের কাগজটি নিয়ে চলে গেলেন কলকাতায়।বিধান চন্দ্র রায়কে খবর নিয়ে হাজির হলের তাঁর দপ্তরে, হাতে একটা রুপার থালা, সেখানে অনুমোদনের চিঠি।গিয়ে বললেন, ‘এই আপনার ফি’। তখন বিধান চন্দ্র রায় চিঠিটি না খুলে খবর দিয়ে আনলেন আনন্দবাজার ও যুগান্তরের দুই চিফ রিপোর্টারকে। তারপর ওই দুজনতে নিয়ে চিঠিটা নিলেন ডা. বিধান চন্দ্র রায়। তিনি তখন বলেছিলেন, এই দুজনেরও অবদান অনেক।
৫.
ভালো কথা। বিধানচন্দ্র রায়কে নিয়ে লেখা সাগরময় ঘোষের লেখা একটি পেরেকের কাহিনি পড়েছেন?

 

লেখক: শওকত হোসেন মাসুম

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সুব্রত দেব নাথ

সিনিয়র নিউজরুম এডিটর

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com