আজ বৃহস্পতিবার, ৬ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং, ২৯শে জিলহজ্জ, ১৪৩৮ হিজরী, শরৎকাল, সময়ঃ দুপুর ১২:৫৫ মিনিট | Bangla Font Converter | লাইভ ক্রিকেট

অস্ফুট আর্তি ।। আবু রাশেদ পলাশ

এপ্রিল’১৫,

মিয়া বাড়ীর মসজিদে ফজরের আযান ধ্বনিত হলে নিশিতে নিদ্রিত মানুষগুলোর নিদ্রা ভাঙে । রাতের গায়ে জোছনা শোভিত অন্ধকার তখন আরেকটি নতুন প্রভাতের ডাক শুনে দিনের আলোয় মুখ লুকায় । গৃহস্থ বাড়ীর মোরগটাও নিদ্রা ভাঙার গান জুড়ে এ সময় । শব্দ শুনে ঘুমকাতর শিশুগুলোকে মায়েরা ঠেলা দিয়ে তুলে দেয় । আধো ঘুমে ঢলঢল শিশুগুলো বাইরে এসে ছাইয়ের গাদা থেকে পুড়া কাঠের কয়লা তুলে মাজন করতে করতে পুকুরের দিকে চলে যায় । একসময় প্রভাত কাকলীর মধ্যে আগমন ঘটে দিনের সূর্যটার ।

গ্রামের নাম চৌহালি । তার জন্মের ইতিহাস কালগর্ভে বিলীন । ওর বুক জুড়ে বহমান কালীনদীর স্রোত প্রবাহ এ গ্রামকে হিন্দু-মুসলমান পাড়ায় বিভাজিত করেছে । নদী নারী পুরুষের মিলনস্থল । স্থান,কাল নির্বিশেষে একই নদীর স্রোত জলে স্নান করে শুদ্ধ হয় সবাই ।এ গাঁয়ে মুসলমান পাড়ার উত্তরে মিয়াদের বাস । অপেক্ষাকৃত জনবহুল এ জায়গাটা গাঁয়ে টুগিপাড়া নামে পরিচিত । এখানে ভূমিহীন ঐ মানুষগুলো বসবাস করে নিম্নবিত্তের দৃষ্টিতেও যারা গরীব । ওদের থাকার জায়গাও সামান্য । ঘরগুলো একটার সাথে আরেকটা লাগানো ।

বুড়ো বাহারুদ্দিন মিয়াবাড়ীতে বয়োজ্যেষ্ঠ । সংসারে স্ত্রী ছাড়াও একমাত্র মেয়ে আছে তার । নাম জরি । কয়েক বছর আগে উজানতলীর হাসেমের সাথে বিয়ে হয়েছিল ওর । সংসার টিকেনি সেখানে । স্বামী তালাক দিলে এখন বাপের বাড়ী এসে থাকে সে । বাহারুদ্দিনের ঘরের সাথে লাগানো ছোট ছাপরা ঘরগুলো আহালু,আরজ আর মধুর ।

চৈত্রের আকালে মধু ভাঙ্গুরা বাজারে বড়কর্তার আরতে কাজ করে । সাথেহিন্দু পাড়ার ভোদড়ও । কাজ শেষে একই পথে বাড়ী ফিরে ওরা । রাতে মধু যখন এসে পৌঁছায় মিয়া বাড়ীর ঘরগুলোতে পিদিমের শেষ আলোটা নিবুনিবু করে তখন । ভেতরে ডুকে ম্যাচের কাঠি জ্বালালে জরির রেখে যাওয়া কিছু একটা চোখে পড়ে তার । আনন্দে চোখগুলো জ্বলজ্বল করে তখন । খেতে বসলে জরির কণ্ঠ শুনা যায় ।

-মধু ভাই আইলা ?

-হ,ঘুমাস নাই অহনো ?

-চইত মাসের গরমে পুইড়্যা মরি ।

-হাঁচানি ? গতরে সার পাইন্যা আইজ, জার করে কেবল ।

-কি কও,জরনি আহে দেহি ?

তারপর মধুর কপালে হাত দিয়ে শিউরে উঠে জরি । কখন যেন জ্বর এসেছে ওর । পরক্ষনে রসুন সমেত তেল গরম করে এনে দেয় তাকে । রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবনায় পড়ে মধু । তখন ভাবনার জগতে সমস্ত জায়গা জুড়ে বিচরণ করে জরি । শেষরাতে ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে তার ।সকালে বাইরে এসে জরিকে খুঁজে সে । দেখা পায়না কোথাও । আহালুর মেয়ে বুচি জানায় ভোরে মামার বাড়ী গেছে সে, আসবে ভরসন্ধ্যায় ।

মুসলমানপাড়ার খড়িমণ্ডল সচ্ছল গৃহস্থ । ঘরে জোড়া বউ তার, সন্তান নেই । এ পাড়ায় সালিশ করে বেড়ায় সে । বাহারি পণ্যের ব্যবসা আছে বাজারে । একই পাড়ার শুলাই মণ্ডলের খাস লোক । মণ্ডলের ব্যবসা দেখাশুনা করে সে । বিকালে ভাঙ্গুরা বাজারে নিজের আরতে বসলে লাভের টাকাগুলো শুলাই তুলে দেয় তার হাতে । সন্ধ্যায় ফেরার আগে এক অচেনা রমণীকে দেখলে খড়িমণ্ডলের চোখ আটকে থাকে সেদিকে । মাঝে মাঝে ডানে বামে তাকায় মেয়েটি । সন্ধানী চক্ষুযুগল পরিচিত কাউকে খুঁজে ফিরে হয়তো । ব্যর্থ হলে আবার স্বস্থানে দাঁড়িয়ে থাকে সে । ফেরার পথে খড়িমণ্ডল নিজের নৌকায় তুলে নেয় তাকে । মণ্ডল বলে,

-কাগো বাড়ীর বেটিগো মাইয়্যা?

-টুগি পাড়া মিয়্যা বাড়ী ।

-গেছিলা কই ?

-ধানশাইল মামুগো বাড়ী ।

-একলানি গেচিলা,মাইয়্যা লোকের ডর নাই ?

মণ্ডলের কথার জবাব দেয়না জরি । ও কথা না বললে মণ্ডলও চুপ হয়ে যায় একসময় । পরক্ষণে নৌকার পাটাতনের উপর একজোড়া সাদা পা দৃষ্টিগোচর হলে চক্ষু পড়ে থাকে সেদিকে । সে পা সহসা চোখের আড়াল হয়না,জরির প্রস্থানেও ।

এদিকে কর্তার আরতে কাজ না থাকলে বাড়িতে অলস সময় কাটায় মধু । ও বাড়ি থাকলে ট্রাঙ্কে রাখা আসমানিরঙা শাড়িটা পড়ে জরি, মাথায় জবজবে তেল দেয় । তারপর ওর সামনে পায়চারী করে অনেকবার । মধু নিজের ঘরের দাওয়ায় বসে হুঁকা টানে । মাঝেমাঝে আড়চোখে জরিকে দেখে সে ।এরমধ্যে একদিন কালবৈশাখী ঝড় হয় গ্রামে । টুগি পাড়ায় আহালুর ঘর পড়ে যায় তাতে । সে উছিলায় একদিন মিয়া বাড়ীতে আগমন ঘটে খড়িমণ্ডলের । মণ্ডল এলে বাহারুদ্দিনের ঘরের দাওয়ায় বসতে দেওয়া হয় তাকে । মনে মনে জরিকে খুঁজে সে । দৃষ্টিগোচর হলে পুলকিত হয় মণ্ডল । যাওয়ার সময় বলে যায়-

-আহালু একবার আইয়ো আমার বাড়ী, কিছু টেহা দিমুনি । ঘরখান তুলো শিগগির ।

রাতে বাড়ী ফিরে ভাবনায় পড়ে মণ্ডল । নৌকার পাটাতনে দেখা একজোড়া সাদা পা আর বাহারুদ্দিনের বাড়ীর দহলিজে দেখা একটা মেয়ে মানুষের মুখশ্রী ভেতরে জ্বালা ধরায় তার । মনে মনে ঘরে তৃতীয় স্ত্রী আনার পাঁয়তারা করে সে । হ্যাঁ, আরেকটা নিকা করবে খড়িমণ্ডল । নিকা করবে নৌকার পাটাতনে দেখা সেই সাদা পায়ের রমণীকেই ।

এরপর মাঝেমাঝেই শুলাইকে মিয়া বাড়ির আশেপাশে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায় । জরিকে খুঁজে সে । দৃষ্টিগোচর হলে খড়িমণ্ডলের দেওয়া জিনিসগুলো তুলে দেয় ওর হাতে । জরি নিতে না চাইলে শুলাই বলে-

-ডরাও ক্যান, আমিনা তোমার কাহা অই ?

বৈশাখ মাসের শেষের দিকে ব্যস্ততা বাড়ে ছেলেদের । ব্যস্ত হয় মেয়েরাও । সামনে আগত বর্ষাকে কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলমান পাড়ার ঘরে ঘরে জাল তৈরির সরঞ্জাম শোভা পায় । বড় ঘরের দাওয়ায় বসে দিনমান জাল বুননের কাজ করে সবাই । আরজের ছেলে হুলু বাজার থেকে সুতা আর বড়শি কিনে এনে মধুর জন্য অপেক্ষা করে । মধুর কাছে মাছ ধরার ছিপ বানিয়ে নিবে সে । কিন্তু সহসা সময় হয়না মধুর । এখন সে হিন্দু পাড়ায় নৌকা মেরামতের কাজে ব্যস্ত । ভোদড় কে সাথে নিয়ে আগামী বর্ষাটা বড়কর্তার নৌকায় কাটানোর ইচ্ছে তার ।এর মধ্যে একদিন রাতে বাড়ী ফিরলে দেখা হয় জরির সাথে । জরি বলে-

-হারাদিন কই থাহ মধু ভাই, দেহিনা যে ?

-কর্তার নাওয়্যা কাম নিছি,বানের মসুম নাওয়্যা থাকুম ।

-হলু হুতা,বশি কিনন্যা আনছে । হেরে বশি বানায় দিও একখান ।

আরজের বউ জুলেখা মারা গেছে একবছর হতে চলল । মরার সময় কলেরা হয়েছিল ওর। স্ত্রী শোকে এখনো বিয়ে করেনি আরজ । মা মরা হুলু সারাদিন পোষাকুকুরের ন্যায় এ বাড়ি ও বাড়ি আনাগোনা করে । ওর দিকে দৃষ্টি গেলে ভেতরটা হাহাকার করে আরজের । মেয়ে মানুষহীন সংসার হয়না । যে ব্যাঘ্র একবার মাংসের সন্ধান পায়, পরমুহূর্তে লোভ সংবরণ করতে পারেনা সে । আজকাল একাকী বিছানায় শুয়ে মেয়ে মানুষের অভাববোধ করে আরজ । নারী সত্ত্বার যে স্বাদ পেয়েছে সে, তার লোভ সামলানোর সাধ্য কোথায়?এখন ঘরে বউ দরকার ।

এরই মধ্যে একদিন শুলাইয়ের সাথে কলহ হয় মধুর । সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে জরিকে হেসে কথা বলতে দেখে সে । শুধু কথা বললে হয়তো কলহ করতনা মধু । শুলাইয়ের দেওয়া জিনিসগুলো যখন জরি নিল তখনই রেগে গেছিল সে । পরক্ষণে শুলাইকে একটা ঘুষি মেরেছে মধু । তারপর চিৎকার করেছে ওর সাথে-

-হারামিরপুলা ইনু কি ?

-আমি আইছিনি, তোমার বইন আইতে কয়যে ?তারপর যাওয়ার সময় শাসিয়ে যায় শুলাই । “ ছাড়ুমনা, মণ্ডলরে কইয়্যা শাস্তা করুম তরে” ।

সেদিন জরির সাথে কথা বলেনা মধু । বড়ঘরের দাওয়ায় থ মেরে বসে থাকে অনেকক্ষণ । খড়িমণ্ডলের কথা মনে হলে অজানা আশংকা এসে ভিড় করে নিজের মধ্যে । মুসলমানপাড়ায় এ মানুষটাকে যমের মত ভয় পায় সবাই । শুলাইকে মারার খেসারত দিতে হবে নিশ্চয় । শুলাই কি আর যে সে মানুষ ! স্বয়ং খড়িমণ্ডলের খাস লোক সে । এ পাড়ায় সবাই সমীহ করে তাকে ।পরদিন দাওয়ায় বসে থাকলে এগিয়ে আসে জরি, মধুরমান ভাঙানোর চেষ্টা করে সে।

-গোস্যা অইছেনি মধু ভাই ? মধু সহসা জবাব না দিলে জরি আবার বলে-“ শুলাইরে হগগল ফিরত দিমু, গোস্যা ছাড়ান দেও অহন” ।

এরপর ভাঙ্গুরা বাজারে গেলে ভয়ে ভয়ে থাকে মধু । সহসা খড়িমণ্ডলের সামনে পড়ার সাহস করেনা সে ।তবুওএকদিন আচমকা ডাক পড়ে ওর । পরক্ষণে খড়িমণ্ডলের আরতে গিয়ে বসতে হয় তাকে । মণ্ডল বলে-

-মধু মিয়ানি, ভালা আছ মুনে কয় ?

-হ, ভালাই । জলদি কইয়্যা ছাড়ান দেন কাম আছে মেলা ।

-বহ মিয়া তাড়া কিয়ের ? মনা একখান বিড়ি দে মধুরে । শুলাইরে মারছ হুনলাম,বিবাদ ছাড়ান দেও । হেতো তোমার কাহা অয় ।

-কাহানি ? আরেকদিন আইল্যা ঠ্যাংখান ভাঙুম কই ।

তারপর আর কথা বাড়ায়না মধু । সোজা গাঁয়ের পথ ধরে সে । আরতে বসে রাগে ফোঁপায় শুলাই । খড়ি মণ্ডল ধমক দেয়-

-চেতস ক্যান হারামিরপুলা, গোস্যানি তর একলা অয় ? ছাড়ুমনা নিয্যস।

বর্ষা মওসুমে হিন্দু-মুসলমান পাড়ার ছেলেরা কাজে ব্যস্ত হয় । কালীনদীর উত্তাল ঢেউয়ের সাথে তখন সম্পর্ক গড়ে ওরা । মধুকে মালবোঝাই নৌকা নিয়ে যেতে হয় ইছামতী । বর্ডারে পণ্য চোরাচালানের ব্যবসা করে বড়কর্তা । এদিকে চৌহালি কাজ না পেলে বিপাকে পড়ে আরজ । নৌকা,জাল কোনকিছুই নেই তার । হিন্দু পাড়ার যোগেশ ওর নৌকায় কাজ দিতে চেয়েছিল তাকে, গতকাল এসে না করে গেছে সে । অবশেষে উপায় না দেখে গণেশের নৌকায় দিনমজুরির কাজ নেয় আরজআলী । একদিন সন্ধ্যায় সওদা করে ফেরার পথে খড়িমণ্ডলের সাথে দেখা হয় তার । মণ্ডল বলে-

-কার নাওয়ে কাম নিছ আরজ, ভালানি ?

-হিন্দু পাড়ার গনশা । দিনমজুরি জুত নাইগো ।

-তাইলে আমার নায়্যা আহ মিয়া, ভালা মজুরি দিমু নিয্যস ।

হিন্দু-মুসলমান পাড়ার দরিদ্র জেলে সম্প্রদায় বর্ষার এ সময়ে অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের স্বপ্ন দেখে । চৈত্র মাসের দারুণঅভাবে জমানো অর্থ খরচ করতে হয় তাদের । আজকের এই দুঃসময়ে খড়িমণ্ডলের প্রস্তাবটা মনে মনে পুলকিত করে আরজকে । অবশেষে মণ্ডলের নৌকায় কাজ নেয় সে । বর্ষার মওসুম শেষ হলে অলস সময় কাটাতে হয় সবাইকে । আশ্বিন মাসে কর্তার আরতে কাজ পাবেমধু। কালীনদীর পশ্চিমে দ্বীপসদৃশ খানিকটা জায়গা । বহুকাল ধরে চর জাগার পাঁয়তারা চলে সেখানে । নদীতে যখন থৈ থৈ পানি তখনো ওটা স্বগর্বে দাঁড়িয়ে থাকে স্বস্থানে । লোকে বলে ভাসান চর । অবসরে মধু জরিকে নিয়ে ভাসান চরে সময় কাটায় । অস্ফুট আর্তিগুলো দিনমান প্রকাশ করেনা কেউ,মনে মনে নিজেদের সহচর ভাবে ওরা । তারপর এক এক করে দিন যায় । না বলা পিছুটান গভীর থেকে গভীরতর হয় ।

টুগি পাড়ার আরজ আলী বর্ষা মওসুমে বড়কর্তার নৌকায় কাজ করে মোটা টাকার মালিক হয় । বাড়িতে টিনের দুচালা ঘর উঠে তার । এ পাড়ার সবাই এখন সমীহ করে তাকে । পলিসটার কাপড়ের একটা শার্ট আর সাদা লুঙ্গিটা পড়ে বাইরে বের হলে সালাম দেয় কেউ কেউ । এগুলো ভাল লাগে আরজের ।পাড়ায়নিজেকেগুরুত্বপূর্ণমানুষ ভাবে সে । ভাববেইতো খড়িমণ্ডলের খাস লোক যে । এ সম্মান টুগি পাড়ায় একমাত্র তারই । এরপর বর্ষা মওসুম শেষ হলে খড়িমণ্ডলের আরতে আবার কাজ পায় আরজ । বিকেলে মণ্ডল এলে খোশ গল্প করে দুজন । মণ্ডল বলে-

-এবার একখান নিকা কর আরজ,একলানি থাহুন যায় ?

খড়িমণ্ডলের কথা শুনে ইতস্তত করে আরজ আলী । কথারজবাব দেয়না সহসা ।পরক্ষণে বলে-

-নিকানি ? মাইয়্যা দেহেন তাইল্যা মিয়া ভাই ।

-মাইয়্যা একখান দেহা আছে, মত দেও মিয়া ।

-কেডা, খুল্যা কন হুনি ?

-বাহারুদ্দির বেটি জরি । সুরতখান দলা দেহি ?

-হাঁচা । তই কাহা মত দিবনি?

– নিয্যস মালুম অয়। চাইলে কতা কই ।

খড়িমণ্ডলের কথায় সম্মতি দেয় আরজ । জরি মেয়ে ভাল,দেখতেও বেশ । মেয়ে মানুষহীন সংসারে আরজের স্ত্রীর পাশাপাশি হুলুর জন্য একজন মা দরকার । অপরিচিত মেয়ে মানুষের মা হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু ? জরি থাকলে সে সংশয় নেই । এরপর হঠাৎই নিজের মধ্যে কেমন কামনা তৈরি হয় আরজের । বাড়ি ফিরে জরিকে নিয়ে ভাবেসে ।অথচ জরির প্রতি এ ভাললাগা কয়েকদিন আগেও ছিলনা তার । খড়িমণ্ডলের বলা আচমকা কথাটা যেন প্রেমিক বানিয়ে দেয় তাকে । চোখের সামনে আনাগোনা করলে আড়চোখে জরিকে দেখে সে । বাড়ন্ত শরীরের প্রতিটি ভাঁজে ভাঁজে উত্তাল যৌবন খেলা করে ওর । দেখলে জ্বালা করে চোখে ।

অবশেষে একদিন খড়িমণ্ডল স্বয়ং নিকার প্রস্তাব নিয়ে যায় বাহারুদ্দিনের কাছে । বাহারুদ্দিন আপত্তি করেনা তাতে । অভাবের সংসারে যেখানে দুমুঠো ভাত জোগাড়করার সামর্থ্য নেই তার , সেখানে আরজ সচ্ছলগেরস্ত । প্রস্তাব মন্দ নয় । সুখী হবে জরি ।বিয়ে আগামী মাঘ মাসে হোক তাহলে । সেদিনরাতে বাড়ী ফিরে বুচির মুখে সব শুনে মধু । জরিকে দেখা যায়না কোথাও । পরদিন ধলপ্রহরে আচমকা মধুর ঘরে এসে হাজির হয় সে । জরি বলে-

-হুনছনি হগল ?তাৎক্ষণিক জবাব দেয়না মধু । ও জবাব না দিলে রেগে যায় জরি । তারপর আবার বলে-“ চুপ মাইরে আছ যে, বোবা অইছ মুনে কয়” ।

মধুর মধ্যে অস্ফুট আর্তনাদ তৈরি হয় তখন । মনে মনে জরির জন্য উতলা হয় সে, কিন্তু সত্যি বলার সাহস পায়না সহসা । সত্যি বলে লাভ কি, যন্ত্রণা ছাড়া ? মধু খুব ভাল করে জানে যেখানে খড়িমণ্ডল বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে, সেখানে ওর কথা শুনবেনা বাহারুদ্দিন । বিয়ে জরির ঠিকই হবে । বিয়ে হবে আরজের সাথেই । পরক্ষণে মধু বলে দেয়-

-আমার কিছু কওনের নাই, হুলুর মা অ তুই ।

মধুর কথা মনে ধরেনা জরির । কাল চোখে দুঃখের ফোয়ারা বয় তার । সেও বলে দেয় –

-দিলে ঘা দিলা মধু ভাই । ভুলুমনা তোমারে নিয্যস ।

অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে কালীনদীর পানি শুকায় । স্রোতস্বিনী নদী তখন কৃপণ হয় । ঢেউ থাকেনা কোথাও,দু একটা মাছ ধরার ডিঙ্গি নৌকা চোখে পড়ে শুধু । সওদাগরের নাও ভাসেনা আর । নদীর উপর জেগে থাকা ভাসানচর দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয় দিনে দিনে । চর দখলকে কেন্দ্র করে গ্রামের মানুষ বিভক্ত হয় । লাঠিয়াল বাহিনী গঠন করে বড়কর্তা আর খড়িমণ্ডল দুজনই । লাঠি চালনায় বিশেষ দক্ষতা থাকায় হিন্দু পাড়ার দায়িত্ব নিতে হয় মধুকে । এ নিয়ে একদিন আরজের সাথে বেশ কলহ হয় তার । আরজ বলে-

-লাঠি চালন ছাড়ান দে মধু । চরের দহল মণ্ডলরে দিমু ।

আরজের কথায় রাজি হয়না মধু । সেও বলে দেয়-

-জান দিমু, চর দিমুনা মণ্ডলরে ।

এরপর একদিন টুগি পাড়ায় শোকের মাতম উঠে ঘরে ঘরে । মাতম উঠে মিয়া বাড়ীতেও । বুড়ি হবিরন বিবি অভিসম্পাত করে মধুকে – দিলে সবুর নাই হারামির, ভাইডারেই খাইল আইজ ।

চরদখলকে কেন্দ্র করে কর্তাবাহিনী আর মণ্ডলবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ হয় চৌহালিতে । ক্ষুদ্র ভাসানচর রঞ্জিত হয় মানুষের রক্তে । আরজ আলী চর দখলে বাঁধা দিলে মধুর সাথে কলহ হয় তার । ক্ষুব্ধ মধু নিজের কাছে থাকা ক্ষুরধার কোঁচটা ছুড়ে দিলে ওটা গিয়ে পীঠে বিঁধে ওর । পরক্ষণে খুন খুন রব উঠে উপস্থিত সবার মুখে মুখে । মধু মিয়া খুন করেছে ওর ভাইকে । তারপর জেলে পড়ার ভয়ে গ্রামটা পুরুষশূন্য হয়ে যায় চোখের পলকে । হিন্দু পাড়ার ভোদড় পালানোর সময় মধুকে সাথে নিতে চাই তার । সে বলে-

-মধু বইনের বাড়ি পলামু, ল যাই ।

সহসা কথা বলেনা মধু । স্বস্থানে থ মেরে বসে থাকে সে । তারপর বলে দেয়-

-যামুনা, ছাড়ান দে আইজ ।

ভাসানচর সংঘর্ষ মামলায় জেল হয় মধুর । খড়িমণ্ডল ভূমি অফিসের লোকদের হাত করে চরের অধিকার নেয় । পরিস্থিতি শান্ত হলে আবার সবাই ফিরে আসে চৌহালি । ভাসানচরে নতুন প্রাণের উচ্ছ্বাস শুনা যায় । ওরা মধুর কথা জানেনা । মধু এ পাড়ায় অতীত এখন । গ্রামে ফিরে ভোদড় দু একবার মধুর খোঁজ নিয়েছিল । তারপর আর খোঁজ রাখা হয়নি ওর ।

এরপর হঠাৎ একদিন খড়িমণ্ডলের ঘরে নবজাতকের ক্রন্দন শুনা যায় । খুশিতে জোড়া বলদ জবাই করে চৌহালি ভোগ দেয় সে । টুগি পাড়ার মেয়েরা বলাবলি করে-

-হুনছনি, মণ্ডলের ঘরে পুলা আইছে । পুলার দেহি চাঁদরূপ ।

-কার কুলে অইলোগো বুচির মা ?

-আমাগো জরির ।

জরি এখন সংসার করছে খড়িমণ্ডলের ঘরে । মধুর খোঁজ আর সবার মত তারও অজানা ।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com