,

AD
নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

মাদকসেবী ৭০ লাখ ॥ তরুণদের পছন্দের শীর্ষে ইয়াবা

লাইক এবং শেয়ার করুন

এমদাদুল হক তুহিন ॥ মাদকের লাগাম টেনে ধরতে দেশে প্রথমবারের মতো চলছে মাসব্যাপী বিশেষ অভিযান ও প্রচরণা। আগ্রাসণ প্রতিরোধের প্রধান প্রন্থা হিসাবে সচেতনতা সৃষ্ঠিকে প্রধান্য দেওয়া হলেও সমানতালে চলছে সাড়াশি অভিযান ও মোবাইল কোর্ট। অপরাধী ব্যক্তিকে সনাক্ত করার সঙ্গে সঙ্গেই দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন মেয়াদের সাজা। আটক করা হচ্ছে নানা ধরণের মাদক। অভিযানের অংশ হিসাবে মাসের প্রথম পনের দিনেই ঢাকা শহর থেকে আটক করা হয়েছে প্রায় ৯২ হাজার পিস ইয়াবা। এছাড়াও ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে আটক করা হয় ৪০ ক্যান বিয়ার, ৫০ লিটার বিলাতি মদ এবং ৯ কেজি গাঁজা।

মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার বৃহত্তর জনমত গড়ে তুলতে চলছে সভা-সমাবেশ ও মানববন্ধন। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর কতৃক বাস্তবায়িত এ পরিকল্পনার অংশ হিসাবে আয়োজন করা হয়েছে বিনামূল্যে কাউন্সিলিংয়ের। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাণিজ্যমেলায় বিশেষ প্যাভিলিয়নে বিশেষজ্ঞ কাউন্সিলরের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ এই সেবা। সচেতনতা সৃষ্টিতে প্রতি দিনই ওই স্টলে অংশ নিচ্ছেন সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি-বর্গ।
মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ খোরশিদ আলম জনকন্ঠকে বলেন, ‘সারা দেশে মাসব্যাপী চলছে বিশেষ অভিযান ও প্রচারণা। মূলত সমাজের প্রতিটি মানুষকে মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার করে তুলতেই আমাদের এই আয়োজন। সচেতনা সৃষ্টিতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্যে সপ্তাহব্যাপী মাদক বিরোধী বিতর্ক প্রতিযোগিতা রয়েছে। এছাড়া মোবাইল কোর্ট ও সাড়াশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর সূত্র জানায়, বিশেষ এ অভিযানে মাসের প্রথম পনের দিনেই কেবল ঢাকা শহর থেকে আটক করা হয়েছে প্রায় ৯২ হাজার পিস ইয়াবা। রাজধানীর শাপলা চত্ত্বর থেকে ১০ হাজার পিস ইয়াবা আটকের পর তাদের দেওয় তথ্যানুযায়ী গাজীপুরের মৌচাক থেকে আটক করা হয় ৭৬ হাজার পিস ইয়াবা। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ৪০ ক্যান বিয়ার, ৫০ লিটার বিলাতি মদ এবং ৯ কেজি গাঁজা আটক করা হয়। মাসব্যাপী চলছে সাড়াশি এ অভিযান।

সূত্র আরও জানায়, বিশেষ এ অভিযানে পুরান ঢাকার নিমতলী এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে উঠা নকল মদের কারখানার সন্ধান পাওয়া যায়। জানা গেছে ওই কারখানায় বিলাতী মদ তৈরির উপকরণ, হাজার খানেক খালি বোতল ও কর্ক পাওয়া গেলেÑতা মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর জব্দ করে।
তথ্য ঘেটে জানা গেছে, দেশে ক্রমাগত বেড়ই চলছে মাদকাসক্তের সংখ্যা। কয়েক বছর আগেও সারা দেশে ৬০ লাখ মাদাকাসক্তের কথা বলেও বর্তমানে এ সংখ্যা ৭০ লাখ। মাদক বিরোধী সংগঠন ‘মানস’র তথ্যমতে দেশে ৭০ লাখ মানুষ মাদকে আসক্ত। আর বেসরকারী জরিপের এক তথ্যমতে এ সংখ্যা ৬৫ লাখের বেশি।

অন্যদিকে জানা যায়, ঢাকা শহরের নামী-দামী স্কুল-কলেজের ৫ হাজার ছাত্রী মাদকে আসক্ত। যাদের অনেকের আনা-গোনা রয়েছে শিশা ক্লাবেও। তবে নারী মাদকাসক্তরে বড় অংশটি ইয়াবায় আসক্ত। মানস’র তথ্যমতে, খোদ রাজধানীতে নারী মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় সংখ্যা প্রায় ১ লাখ। মাদকনিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের জরিপ অনুযায়ী, নারীদের ৮০ শতাংশ কেবল বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে মাদকের প্রতি আসক্ত হচ্ছে। মাদকাসক্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও মাদক নিরাময় ও পূনর্বাসন কেন্দ্রগুলোর অবস্থা নাজেহাল। দেশে অনুমোদিত ৯০ টি মাদক নিরাময় কেন্দ্র থাকলে চিকিৎসার নামে বাণিজ্য চলছে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫০০‘র অধিক। আর ওইসব প্রতিষ্ঠান থেকে চিকিৎসা নিয়ে আলোর পথে ফিরে আসা মানুষের সংখ্যা নগণ্য বলেই জানা গেছে। ফলে তারা পরিত্রান পাচ্ছে না মাদকের ভয়াল গ্রাস থেকেও!

সারা দেশের অলিতে গলিতে ছড়িয়ে পড়েছে মাদক। ঢাকা শহরের রেল লাইনের ধার, বস্তিসহ সর্বত্রই মিলছে নানা ধরনের মাদক। বাসা-বাড়ির ছাদ, পরিত্যক্ত ভবন, মেস-বাসা, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্জন এলাকা, পাড়ায় নির্মানাধীন কনস্ট্রাকশন বিল্ডিং মাদক গ্রহণের ক্ষেত্রে অনেকটা অভয়ারণ্যের মত! পার্টি কিংবা আড্ডা দেওয়ার নাম করে চলে মাদকে বুদ হওয়া। দেশে মাদকদ্রব্যের মধ্যে হিরোইন, ফেনসিডিল, বিয়ার, মদ গাজাসহ নেশাজাতীয় সিরাপ ও ঘুমের ট্যাবলেট উল্লেখযোগ্য হলেও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ইয়াবার জনপ্রিয়তাই শীর্ষে। জানা গেছে এলাকা বা আড্ডাবেধে প্রতিটি নেশা জাতীয় দ্রব্যের রয়েছে আলাদা নাম। যেন আড্ডার বাইরের কেউ কোনক্রমেই বুঝতে না পারে-ওই ব্যক্তিটি মাদকে আসক্ত!

সংশ্লিষ্ট একাধিক মাদকসেবীদের অভিযোগ, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়া চালানের বড় অংশটিই আবার চলে যাচ্ছে মাদক বিক্রেতাদের হাতে। মাদকসহ কোন ব্যক্তি ধরা পড়লেও উৎকোচের মাধ্যমে ছাড়া পেয়ে যায়। গত ৭ বছরে দেশে ইয়াবার চোরাচলান বেড়েছে ১৭৭ গুণ! গেল বছর কেবল বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-ই ৫০ লাখ ৫৬ হাজার ইয়াবা বড়ি আটক করেছে। এছাড়া একই বছরে তারা পৌনে পাঁচ লাখ বোতল ফেনসিডিল, ১০ কেজি হিরোইন এবং ২০ লাখ টন গাঁজা আটক করে। এছাড়া অন্যান্য বাহিনীর হাতেও আটক হয়েছে মোটা অঙ্কের মাদক।

জানা গেছে, মিয়ানমার থেকে সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ইয়াবা প্রবেশ করলেও ধরা পড়ছে যৎসামান্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় অসাধু সদস্য, রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন সংস্থার লোকজনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় গ্রাম থেকে শহর-সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে এই বড়ি। গড়ে উঠেছে ইয়াবা বিক্রির আলাদা এক সিন্ডিকেট। ইয়বায় আসক্তদের একটি অংশ রাজনৈতিক বা শক্তিমত্তার পরিচয়ে গড়ে তুলছে অবৈধ ও সমাজ বিধ্বংসী ওই সিন্ডিকেট।

মাদকের ভয়াল গ্রাসে ধ্বংস হচ্ছে পরিবারিক বন্ধন। ভেঙ্গে পড়ছে সামাজিক ভিত্তি। এমনকি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে হতাশার বিষবাষ্প। ওই পরিবারগুলোতে নেমে আসছে অর্থনৈতিক দৈন্যদশা। ফলে মাদকাসক্তের পরিবারে ঘটছে বিবাহ বিচ্ছেদেরও মত মারাত্মক ঘটনাও! তাই মাদকের আগ্রাসণ রোধে সচেতনতা সৃষ্টির বিকল্প নেই বলে মনে করেন একাধিক বিশেষজ্ঞ। শুক্রবার চাঁদপুরের হবিগঞ্জ উপজেলায় মাদকবিরোধী এক সমাবেশে প্রতিষ্ঠানটির অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) মো: আমির হোসেন বলেন, দেশে ৭০ লাখ মানুষ মাদক নিচ্ছে। যার বড় অংশটিই তরুণ। মাদকের এই ভয়াবহ বিস্তার রোধে রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার প্রয়োজন। ভারত ও মায়ানমার থেকে মাদকের বড় চালান আসছে উল্লেখ করে তিনি সাধারণ মানুষকে মাদকের বিরুদ্ধে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডীন অধ্যাপক ডা: এ বি এম আব্দুল্লাহর মতে, সচেতনা সৃষ্টিসহ কঠোর আইন করে মাদক দ্রব্যের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। পারিবারিক সচেতনা বৃদ্ধি করতে হবে, বিশেষভাবে যতœশীল হতে হবে সন্তানের ওপর। সন্তানের মধ্যে কোনরুপ রিরুপ আচরণ লক্ষ্য করা গেলে অভিবাবকের উচিৎ মনোবিজ্ঞানীর ধারস্থ হওয়া বলেই তার মত।


লাইক এবং শেয়ার করুন
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও অন্যান্য সংবাদ