র‌্যাগিং সংস্কৃতিকে না বলুন !

এই সংবাদ ৩৯ বার পঠিত

মেহেদী জামান লিজন # এসএসসি এইচএসসি দুটোতেই ভাল রেজাল্ট , যেকোন একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির স্বপ্ন । এমন সময় বড় ভাইয়ার একটি কথা মনে হচ্ছে, “বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবি র‌্যাগিং বুঝিসতো!” তো র‌্যাগিং পত্রিকায় দেখেছি এর খবর তবে বুঝতে চাইনি সময় ছিল না। তু বড় ভাই বললেন, বলিউডের একটা মুভি আছে ‘টেবিল নম্বর-২১’ তুইতো আর ছোট্ট বাচ্চা না, তাই দেখে নিস। ভাইয়ের কাছ থেকে মুভিটি নিয়ে পুরোটাই দেখলাম । আর আতংক কাটতেই চায়না। র‌্যাগিং কত নৃসংশ হতে পারে তা ভেবেও কূল পাই নি । মুভিটার মূল ম্যাসেজটা হলো ‘ ‘Ragging is not a joke, it’s a CRIME!’

 

এতো গেল র‌্যাগিং পূর্ব আতঙ্কের কথা তবে যারা র‌্যাগিং এর শিকার তাদের অবস্থাও ভয়াবহ। বাংলাদেশের এমন কোন পাবলিক ইউনিভার্সিটি নেই যেখানে র‌্যাগিং নেই। গুগলের এর সার্চ অপশনে সার্চ দিলেও পাওয়া যায় এরকম কয়েকটি বীভৎস ঘটনা। একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ‘শেষরাত পর্যন্ত একপায়ে দাঁড় করিয়ে ছাত্রীদের র‌্যাগ দেয়ার নির্মম ঘটনাটি ঘটেছে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি)। র‌্যাগিংযের নামে ছাত্রীদের মানসিক ও মধ্যযুগীয় কায়দায় শারীরিক নির্যাতন করায় ৯ ছাত্রী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। নির্যাতনের শিকার ছাত্রীদের অনেকেই পরদিন ক্লাস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেনি।

 

প্রতিবেদনে দেখা যায়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ম বর্ষের শিক্ষার্থীরা র‌্যাগারদের শাস্তি চেয়ে ভিসি বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন। এ ঘটনায় ৬ শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। এখন র‌্যাগিং বন্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে জাবি প্রশাসন। ইন্টারনেটের কল্যাণে এখন র‌্যাগিং লিখে গুগলে সার্চ দিলেই শত শত র‌্যাগিং এর ঘটনা সামনে চলে আসে। আইন করেও বন্ধ করা যাচ্ছে না র‌্যাগিং নামের এ নির্মমতা। উচ্চ শিক্ষা যাদের জন্য স্বপ্ন তাদের জন্য অপেক্ষা করে র‌্যাগিং নামের দু:স্বপ্নও। ভর্তি যুদ্ধে জয়ী হয়ে র‌্যাগিং নামক তিরষ্কারের শিকার হতে চায়না কোন শিক্ষার্থীই।

 

প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে র‌্যাগিং এর ভয়াবহতা তেমন নেই, তবে আছে ভিন্নতা। সেখানে দেখা যায়, সাধারণ শিক্ষার্থীদেরকে পুতুলের মতো ব্যবহার করে সিনিয়র শিক্ষার্থীরা। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে ২য় বর্ষের শিক্ষার্থীরা। নিজেদের প্রয়োজন যে কোনো অপরাধে ব্যবহার করে তাদেরকে। ক্যাম্পাসে মারামারি, চাঁদাবাজি, লুটপাট, গাড়ী ভাংচুর এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে ছিনতাইসহ নানা অপকর্মের সাথে জড়িয়ে পড়ে এ সকল শিক্ষার্থীরা। আবার অনেক শিক্ষার্থী ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের অপরাজনীতির শিকার হয়ে নিজের মেধাকে সঠিক কাজে লাগাতে পারছে না।

 

আর এ অপরাজনীতির কারণে সামান্য অজুহাতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর অন্যায়ভাবে হামলা চালাচ্ছে তারা। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রসাশনও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না। হলে সিট পাওয়ার জন্য বড় ভাইরা যা বলেন তা শুনতে হয়। তা না হলে হল থেকে বের করে দেয়া হয়।যদি কোনো শিক্ষার্থী বড় ভাইদের অপকর্মের সাথে জড়িত না হয়। তাহলে তার ওপর ব্যাক্তিগত আক্রোশ থেকে যায় । আর ওই আক্রোশের জের ধরে সময়ের প্রেক্ষিতে নানা ব্লেইম দিয়ে হল থেকে বের করে দেয়া হয়। অথবা ক্যাম্পাসে তাদের ওপর অন্যদের মাধ্যমে অতর্কিত হামলা চালানো হয়। এতে পঙ্গুত্ববরণ করাসহ গুরুতর আহত হয়েছেন অনেকে।

 

এসব হামলার ঘটনার পর নামে তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও অদৃশ্য কারণে রিপোর্ট কখনোই প্রকাশ করা হয় না। আবার রিপোর্ট প্রকাশ করা হলেও দোষীদের বিরুদ্ধে নেয়া হয় না কোন ব্যবস্থা। হাত, পা ও চোখ বেঁধে নির্যাতন করার কারণে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন অনেক শিক্ষার্থী। মারধরের সময় বস্ত্রহীন করে মেধাবী শিক্ষার্থীদেরকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রেখে নির্মম নির্যাতন করার ঘটনাও ঘটেছে বেশ কয়েকটি হলে। তবে সব অভিযোগই বরাবরই থাকে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে।

 

ঘটনা প্রকাশের পরও মাথা ব্যথা নেই প্রশাসনের। নির্যাতনের আগে ও পরে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত হল প্রোভোস্টের মোবাইল ফোনও বন্ধ থাকে বলে নানা প্রতিবেদনে দেখা যায়। হামলা বা মারধরের পর আবাসিক শিক্ষকরা হলে আসলেও আটক শিক্ষার্থীদের উদ্ধারে তারা কোন দায়িত্ব পালন করেন না। অনেক সময় এগিয়ে আসা শিক্ষকদের লাঞ্ছিতও করা হয়। র‌্যাগের ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিকই রয়েছে। এর নেতিবাচক দিকটি তাৎক্ষণিক হলেও ইতিবাচক দিকটি সুদূর প্রসারী। কেননা কাউকে র‌্যাগ দেওয়ার বিষয়টি আকস্মিক। যেহেতু সে এই বিষয়ের জন্য প্রস্তুত থাকেনা তাই তার মধ্যে এক ধরনের ভীতি কাজ করে। যা পরবর্তীতে তার শারীরিক বা মানসিক সমস্যার সৃষ্টি করে। এবং দ্রুততার সাথে সমস্যা থেকে কেটে ওঠার চেষ্টা করে।

 

অনেক সময় শিক্ষার্থীরা নতুন পরিবেশের সাথে নিজেকে এডজাস্ট করাতে না পেরে হীনমন্যতায় ভোগেন। যা তার চলার পথে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তবে এর সুদূর প্রসারী যে প্রভাব রয়েছে তা হলো এটি বড়দের সাথে ভালো সম্পর্ক তৈরির একটি অন্যতম মাধ্যম। এর মাধ্যমে পরবর্তীতে বড়দের সাথে একটি ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অনেকে আবার বলেন , র‌্যাগ শিক্ষার্থীদের এক ধরনের শিক্ষনীয় বিষয়। যার মাধ্যমে ছেলেরা অনেক স্মার্ট হয়। র‌্যাগ শিক্ষার্থীদের আধুনিক ও সংস্কৃতিমনা করে তুলে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সকল প্রকার জড়তা দূর হয়, তাদের ভেতর আরো কোন ভয় থাকেনা। তারা সব সময় সাহসীকতার সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারে। এমনকি বড়দের সাথে কিভাবে আচরণ করতে হয় তাও অনেকটা র‌্যাগের মাধ্যমে শিখে।

 

র‌্যাগের মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। কিছু র‌্যাগ আছে যা শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষনীয়। কিন্তু আবার অনেকে এমন র‌্যাগ দেয় যেখানে র‌্যাগের নামে চলে নির্যাতন। এর ফলে অনেক শিক্ষার্থীরা হতাশ হয়ে যায়। আমি এটাকে কখনো সমর্থন করি না। বিশ্ববিদ্যালয়ে র‌্যাগিং এর সংস্কৃতিটা সবচেয়ে বেশি। এখানে র‌্যাগের নামে আনেক নির্মমতারও প্রমান রয়েছে। এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী বহিস্কারও হয়েছে। কিন্তু র‌্যাগ বন্ধ হয়নি। প্রথম বর্ষে র‌্যাগের ভয়ে অনেকে অধিকাংশ সময়ই ক্যাম্পাসে ঘুরাঘুরি করেন । মানসিকতার পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন। কারন যে শিক্ষার্থী র‌্যাগিংয়ের শিকার হচ্ছে সে আবার তার জুনিয়রদের র‌্যাগ দিচ্ছে। সে আবার তার জুনিয়রদের র‌্যাগ দিচ্ছে। এভাবেই বছরের পর বছর র‌্যাগ চলে আসছে…

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com