সরব ফেসবুক আবারও ভূমিকম্প! আতঙ্কগ্রস্ত আমি ও আমরা

১৬ বার পঠিত

এস.কে.দোয়েল # দিনের ক্লান্তি নিরসনে ঘুমের বিভোর ছিল শান্তিপ্রিয় মানুষগুলো। রাত্রি শেষে ভোর হয়ে আসছি। ফজরের আযান হবে নিকটস্ত মসজিদ হতে। ঠিক এই সময় হঠাৎ করেই মোচর দিয়ে উঠলো পৃথিবীর ভূমিস্তর। সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্ক। চেচামেচি, ভূমিকম্প ভূমিকম্প বলে আর্তচিৎকার। কে কিভাবে ঘর থেকে ঘর থেকে বের হয়ে বাইরে খোলা মাঠের দিকে আসবে এমন দৌড়ঝাপ। চোখের সামনে দুলছে ঘর, ঘরের আসবাবপত্র এবং আতঙ্কগ্রস্ত ব্যক্তিও। অন্তর ও মুখে রবরব কলরব। করুণ আর্তিতে আল্লাহকে স্মরণ। দু’আ দরুদ পাঠ, কারো মুখে আল্লাহ্ আকবার আল্লাহ্ আকবার আযানের ধ্বনি।

 

প্রায় ৩০ সেকেন্ডের স্থায়ী আজ সোমবার ভোর ৫টা ৬মিনিটে সংঘটিত ভূমিকম্প সারাদেশের মানুষকে এভাবেই আতঙ্কগ্রস্ত করেছে। ভূকম্পন সরে গেলে স্বজনদের কাছে ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করেছে পরিবারগুলো। রাজধানী পূর্ব জুরাইনে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে তাড়াহুড়া করে নামতে গিয়ে আহত হয়েছেন ২৯ জন। আরেক হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে মারা গেছে। এ পর্যন্ত দুজনের নিহতের খবর জানা গেছে বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে। এ শক্তিশালী ভূমিকম্পের উৎপত্তি ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে ভারতের মনিপুর রাজ্যে। যা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম থেকে ৩৩১ কিলোমিটার উত্তর পূর্বে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৬.৯। ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র ছিল ইম্ফল থেকে ৩৩ কিলোমিটার পশ্চিম উত্তর-পশ্চিম এবং ঢাকা থেকে ৩৫১ কিলোমিটার পূর্ব উত্তরেপূর্বে ভারত-মিয়ানমার সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায়।

 

উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের ৩৫ কিলোমিটার গভীরে। যা চট্টগ্রাম, হিলি, রাজশাহী, সিলেট, রংপুর, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, দিনাজপুর, মৌলভীবাজার, পঞ্চগড়, কিশোরগঞ্জ, মেহেরপুর, নেত্রকোনা, বগুড়া, গাজীপুর, সাতক্ষীরা জেলাগুলোতে প্রচন্ডভাবে অনুভূত হয়। ২০১৫ সালের ২৫ এপ্রিল থেকে মে মাসে নেপালে বেশ কয়েকটি বড় মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এতে সেদেশের আট হাজারের বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। আর এ ভূকম্পনে কেঁপে ওঠে বাংলাদেশও। এতে বাংলাদেশে কোনো প্রাণহানির ঘটনা না ঘটলেও দেশের বিভিন্ন স্থানে বহুতল ও পুরোনো ভবনে ফাটল দেখা দেয়, আতঙ্কে মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় বের হয়ে আসে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশও বেশ বড় মাত্রার ভূমিকম্প ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

 

আজকের এই ভূমিকম্পন নিয়ে অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগ সাইটে সারাদিন ভর চলেছে অনুভূতির বর্ণনা। ভূকম্পনের সময় কার কেমন অনুভূতি ছিল, কে কেমন টের পেয়েছিল তা নিয়ে সরব ছিল ফেসবুক। আসুন কিছু ফেবুদের স্টেটাস পড়ে জেনে নেই কেমন ছিল ভূমিকম্পন। ফেবু শামীম আরেফিন তার স্ট্যাটাসে লিখেছেন. কম্পনটা এখনও শেষ হয়নি। অন্তত আজকের ভূমিকম্প নিয়ে কোন প্রকার ফান করার সাহস আমার নেই। আপনার হয়তো থাকতে পারে। আপনি অনেক সাহসী, তাই ফান করতে পারছেন! যাইহোক, জানা গেল ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতের মনিপুর। বাংলাদেশে এর মাত্রা ছিল ৬.৭ বা ৬.৮। মনিপুরের কথা ভাবছি। কোন খবর পাইনি এখনো!

কাজী কামারুজ্জামান তরঙ্গ পবিত্র কালামের একটি সূরা নিয়ে সুন্দরভাবে স্টেটাস দিয়েছেন। তিনি সূচনা করেছেন, ভূমিকম্প হল আমি এখন মাদারীপুর জেলাতে আছি ! আমাদের পুরো বাড়িটা অনেকক্ষন ধরে কাঁপলো ! প্রথমে ভাবছিলাম আমার শারিরিক সমস্যা, তারপরই দেখি আমাদের ঝাড়বাতি ফ্যান খুব দুলছে ! বোতলের পানি কাঁপছে ! এরপর তিনি পবিত্র কুরআনের ৯৯ নম্বর সূরা যিলযাল বঙ্গানুবাদ উল্লেখ করেন,

(১) যখন পৃথিবী তার (চূড়ান্ত) কম্পনে প্রকম্পিত হবে। (২) যখন ভূগর্ভ তার বোঝাসমূহ উদ্গীরণ করবে। (৩) এবং মানুষ বলে উঠবে, এর কি হ’ল? (৪) সেদিন সে (তার উপরে ঘটিত) সকল বৃত্তান্ত বর্ণনা করবে। (৫) কেননা তোমার পালনকর্তা তাকে প্রত্যাদেশ করবেন। (৬) সেদিন মানুষ বিভিন্ন দলে প্রকাশ পাবে, যাতে তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম দেখানো যায়। (৭) অতঃপর কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা সে দেখতে পাবে। (৮) এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তাও সে দেখতে পাবে।’

কলকাতা থেকে কন্ঠশিল্পী ও মডেল শফিকুল ইসলাম লিখেছেন. ভোরের আজানের আগ মুহুর্তে বড় ধরনের এ ভূমিকম্প অনুভূত । হয়ত সৃষ্টি ও সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করার জন্য মানুষের প্রতি তাঁর ৬.৭ মাত্রার ছোট্ট একটি নির্দেশ।গাজীপুর থেকে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক ও লেখক শহীদুল হক খন্দকার বলেছেন, ভূমিকম্পে বাংলাদেশে এর চেয়ে বেশি ঝাকি কখনো অনুভূত হয়েছে কি না আমি জানি না। তবে আমার জীবদ্দশায় এবারই এতটা বেশি ঝাকি বলে মনে হলো। যাই হোক, এ থেকে যে আমরা কিছুই শিখবো না, তা নিশ্চিত। তবে বলা যায়, রড সিমেন্টের বিজ্ঞাপনের ধরন কিছুটা পাল্টাবে।

আজ আমরা ইট-পাথরের নিচে চাপা পড়ে গেলে কী করতাম। কষ্টার্জিত সহায় সম্পদ কী কাজে লাগতো? বিভিন্ন পন্থায় সম্পদ অর্জন করে সেই সম্পদের নিচে চাপা পড়ার কোন মানে হয়!  তবে সততা থাকলে মরেও শান্তি। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। আর সতত ঈমানের উপর মজবুত রাখুন। সিলেট থেকে পাপলু বাঙালি নেপালের ভূমিকম্পনের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে লিখেছেন, ‘সিলেটের সঙ্গে ভূমিকম্পের বৈরিতা কয়েক’শ বছরের। এখানের ইতিহাস-ঐতিহ্য-প্রত্নতত্ত নিদর্শন সবকিছু মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিল এই ভয়ঙ্কররূপী প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভূমিকম্প। ১৫৪৮ সালের প্রচণ্ড ভূমিকম্পে সিলেট অঞ্চলের ব্যাপকহারে ভূ-পরিবর্তন ঘটে।

 

উঁচু-নিচু পাহাড়-পর্বত সমতল ভূমিতে পরিণত হয়। আমাদের এই অঞ্চলের মানচিত্র পাল্টে দেয় ১৬৪২, ১৬৬৩, ১৮১২ ও ১৮৬৯ সালের ভূমিকম্পে। সিলেট অঞ্চলে এ যাবৎকালের সবচেয়ে ধ্বংসাত্বক ভুমিকম্প ১৮৯৭ সালের ১২ জুন বিকাল সোয়া ৫টার দিকে সংঘটিত হয়। যেটি ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থ কোয়াক’ নামে পরিচিত। ৮ দশমিক ৭ মাত্রার সেই ভয়ংঙ্কর ভূমিকম্প ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৫৫০ বর্গ কি.মি. এলাকায় পাকা দালানকোঠার ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। সঙ্গে সঙ্গে এই অঞ্চলের শত বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য চিহ্ন মাটির সঙ্গে মিশে যায়। সভ্যতা মুছে দিয়ে এই অঞ্চলকে করে তুলে সাংস্কৃতিক জায়গা থেকে রিক্ত শূন্য।

 

সেই ভূমিকম্পে সৃষ্টি হয় বিশাল আকারের হাওর, বিল ও জলাশয়ের, যা আজো বিদ্যমান। ভূমিকম্পের জন্য সর্বোচ্চ বিপদজনক একটা অঞ্চলকে নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন কিংবা রাষ্ট্রের কোন মাথা ব্যাথা নেই। বরং দেশের ভূগর্ভস্থ কাঠামো এবং প্রাকৃতিক সম্পদের স্বার্থকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়া সেভরনকে দেয়া হয় ত্রিমাত্রিক জরিপের জন্য বিভিন্ন পাহাড়-বন-জঙ্গল বরাদ্দ। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানি তাদের ইচ্ছে মতো মৃত্তিকার বুকে রক্ত ক্ষরণ ঘটিয়ে মুনাফা লুটে। নব্য মধ্যবিত্তের কাছে হুট করে টাকা পয়সা আসায়। তারাও নিয়ম-অনিয়মের তোয়াক্কা না করে একটার পর একটা বিল্ডিং করে যাচ্ছে। নদীগুলোকে মেরে ফেলা হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

 

ভূমিকম্পন সম্পর্কে তরুণ লেখক রিপন কুমার ঘোষ “ভূমিকম্পঃ আতংকিত নয়, সচেতন হোন নিবন্ধ আকারে শিরোনামে চমৎকার স্টেটাস দিয়েছেন। সে স্টেটাসে যেমন লিখেছেন বাস্তবতা, তেমনি করেছেন সচেতন। তিনি লিখেছেন, ২০০৮ থেকে এ অবধি ভূমিকম্প পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা বিষয়ক অনেকগুলো প্রশিক্ষণ ও মহড়ায় আমার অংশগ্রহণের সুযোগ হয়েছে। বর্তমানে নিজের ব্যক্তিগত পেশার পাশাপাশি জরুরী সাড়াদান পরিকল্পনা বিষয়ক প্রশিক্ষক হিসেবে কমিউনিটি লেভেলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তালিকাভুক্ত স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে কাজ করছি। দুর্যোগ বিশেষত ভূমিকম্প নিয়ে কাজ করার ফলে এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা আমার দায়ীত্বের মধ্যে পড়ে। তাই ভূমিকম্পের আগে-পরে করণীয় নিয়ে কিছু লেখার চেষ্টা করছি।

বাংলাদেশ বিশেষ করে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল মারাত্বক ভূমিকম্প ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সিলেটের তামাবিল সীমান্তের ঠিক পাশে ভারতের মেঘালয়ের ডাউকি জেলার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে একটি মারাত্বক ঝুঁকিপূর্ণ ফল্ট যা ‘ডাউকি ফল্ট’ নামে পরিচিত। এটি খুবই সক্রিয় ফল্ট। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অন্তর এর বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়। এবং প্রতিবারই দেখা যায় এটি আগের অবস্থান থেকে সরে গেছে। সর্বশেষ ১৮৯৭ সালে এই ফল্ট থেকে এক বিধ্বংসী ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়, যা ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থ কোয়াক’ নামে পরিচিত। এই ভূমিকম্পের প্রভাবে সিলেটের ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যে অনেক পরিবর্তন ঘটে। মাটির সাথে মিশে যায় সিলেটসহ ঢাকা, ময়মনসিংহ, রংপুরের অনেক উল্লেখযোগ্য স্থাপনা। ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় ঢাকার নবাব পরিবারের আবাস ‘আহসান মঞ্জিল’।

 

ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের বিশেষত্ত্ব হচ্ছে প্রতি একশো বছরে সেখানে একটি বড় ভূমিকম্প আঘাত হানে। সেই হিসেবে আমাদের এই অঞ্চলে সর্বশেষ ভূমিকম্পের ১১৯ বছর পেরিয়ে গেছে। ভূ বিশেষজ্ঞদের মতে আমাদের এই অঞ্চলে কমপক্ষে সাত মাত্রার দশটি ভূমিকম্প পাওনা হয়ে গেছে। আজ ভোরের ৬.৮ মাত্রার ভূমিকম্পটি যদি কোনভাবে ডাউকি ফল্টে ঘটতো তবে এতোক্ষণে সিলেট, ঢাকা, চট্টগ্রাম, শিলং, গৌহাটিসহ আরো অনেক শহর-জনপদ ধ্বংসের জনপদে পরিণত হতো। মনিপুরে উৎপন্ন ভূমিকম্পের প্রভাবে সমগ্র বাংলাদেশ তো বটেই ভারতের পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত যেভাবে তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে কেঁপে উঠেছে তা স্মরণকালের তীব্র। পাশের বাসার এক পচাত্তর বছরের বৃদ্ধার মুখেও শুনলাম ‘এমন ভূমিকম্প আমার বাপের জন্মে দেখিনি’।

 

ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি যতোটা না প্রাকৃতিক তার চাইতে বেশী মনুষ্যসৃষ্ট। মানুষের অতিলোভ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। আগের ভূমিকম্পগুলোতে জানমালের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল নিতান্তই সামান্য। কিন্তু এখন যদি একটি সাতমাত্রার ভূমিকম্প ঘটে তবে বিস্তীর্ণ এলাকা বিরাণভূমিতে পরিণত হবে। ১৮৯৭ সালের পর সিলেট ও আসাম অঞ্চলে হাফ দেয়াল ও উপরে বেড়ার উপর চুন-সুরকির প্রলেপ দেওয়া এক ধরণের বাসা-বাড়ির প্রচলন ঘটে। যা আসামিজ স্টাইল নামে পরিচিত। এছাড়া কাঠের ঘর-বাড়িরও প্রচলন ছিলো। সিলেটের পুরনো মহল্লাগুলোর আনাচে কানাচে এখনও এমন কিছু বাড়ির দেখা মেলে। গত পনের বছরে সিলেট শহরের চালচিত্র বদলে গেছে অনেকখানি। এক সময়ের শান্ত ছোট্ট শহর ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। শহরের বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে হাজার হাজার বিশাল অট্টালিকা। সুউচ্চ ভবনগুলোর দিকে তাকালেই গলা শুকিয়ে আসে। ঢাকার অবস্থা তো আরো শোচনীয়! এই অপরিকল্পিত নগরায়নই ভূমিকম্পের প্রধান ক্ষয়ক্ষতির কারন।

 

ভূমিকম্পকে আটকানো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এর কোন পূর্বাভাসও দেয়া যায়না। তাই ভূমিকম্প থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায় যথাযথ পূর্ব-প্রস্তুতি। কথায় আছে, Prevention is better then cure অর্থাৎ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ সর্বোত্তম উপায়। কিছু সতর্কতামূলক প্রস্তুতি নিলে আমরা ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনতে পারি অনেকাংশে।

ভূমিকম্প পূর্ববর্তী প্রস্তুতিঃ

১. কবে না কবে ভূমিকম্প হবে সেই ভয়ে এই প্রস্তুতি আপনার কাছে হাস্যকর মনে হতে পারে! তবুও আমরা যেহেতু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মধ্যে আছি তাই হাতের কাছেই নিরাপদ জায়গায় সবসময় ফাস্ট এইড বক্স, টর্চলাইট, রেডিও ও শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করে রাখুন। মনে রাখবেন ভূমিকম্প কখনোই ঘূর্ণিঝড়ের মতো পূর্বাভাস দিয়ে আসেনা।

২. ঘরের সদস্যদের সমান সংখ্যক হেলমেট জোগাড় করে রাখুন। যদি হেলমেট নাই থাকে তবে বালিশগুলো ভালো তুলা দিয়ে যথেষ্ট মোটা করে তৈরি করুন। মনে রাখবেন ভূমিকম্পের সময় মাথা বাঁচানোটাই হচ্ছে আসল কাজ।

৩. অযথা মোবাইলের চার্জ নষ্ট করবেন না। সম্ভব হলে সাথে ব্যাকআপ ব্যাটারি রাখুন। বর্তমানে মোবাইল চার্জ দেয়ার জন্য পোর্টেবল পাওয়ার ব্যাংক পাওয়া যায়, সেটিও রাখতে পারেন সাথে।

৪. ঘরের আসবাবপত্র বিশেষ করে খাট ও টেবিল শক্ত কাঠ দিয়ে, আরো উঁচু করে তৈরি করুন। এতে করে ভূমিকম্পের সময় এদের তলায় ঢুকে আত্মরক্ষা করতে পারবেন। ৫. রান্নার কাজ শেষ হলেই গ্যাসের চুলা নিভিয়ে রাখুন। ৬. ঘরের ত্রুটিপূর্ণ গ্যাস ও বৈদ্যুতিক সংযোগ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মেরামত করুন। ৭. জরুরী সাহায্য প্রদানকারী সংস্থাগুলোর টেলিফোন নম্বর মোবাইলে সেভ করে রাখুন। ৮. ঘরে ঝুলন্ত কোন বস্তু (যেমনঃ ঝাড়বাতি) রাখবেন না। আলমারী, শোকেস, সানশেড, বা তাঁকের উপর ভারী কিছু রাখবেন না

ভূমিকম্পকালীন করণীয়ঃ

ক) আতংকগ্রস্থ না হয়ে ধীর স্থির থাকুন। পরিবারের সকলকে নিয়ে (শিশু ও বৃদ্ধদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে) দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে খোলা জায়গায় আশ্রয় নিতে হবে। খ) বহুতল ভবনে অবস্থানকালে জরুরী নির্গমন পথ না পেলে বের হওয়ার চেষ্টা না করে সেই ভবনের পিলারের নিচে অবস্থান নিন। মনে রাখবেন পিলার সাধারণত ভেঙে পড়েনা। আপনি আটকা পড়লেও উদ্ধারকারীরা সহজেই আপনাকে উদ্ধার করতে পারবেন। গ) হাতের কাছে হেলমেট থাকলে দ্রুত পরিধান করুন। হেলমেট না পেলে মাথার উপর বালিশ চাপা দিন। মনে রাখবেন মাথা বাঁচাতে পারলেই জীবন বাঁচবে। অনেকসময় বিল্ডিং ভেঙে পড়েনা কিন্তু ছাদের প্লাস্টার খসে পড়ে। এগুলো মাথায় আঘাত হানলে নির্ঘাত মৃত্যু। হেলমেট বা বালিশ জাতীয় কিছু নাই পান তবে দুহাতের কবজি দিয়ে মাথা ঢেকে রাখবেন। ঘ) টেবিল বা খাটের নিচে আশ্রয় নিন। ঙ) গ্যাসের লাইন চালু থাকলে তা দ্রুত বন্ধ করার চেষ্টা করবেন।  চ) বিদ্যুতের মেইন সুইচ বন্ধ করুন। এতে করে আগুন লাগার সম্ভাবনা কমে যাবে। ছ) বহুতল ভবনে অবস্থান করলে ভুলেও লিফট ব্যবহার করবেন না। জ) গাড়িতে থাকলে গাড়ি চালনা বন্ধ করে গাড়ির মধ্যেই অবস্থান করতে হবে। ঝ) নদী বা পুকুরে অবস্থান করলে দ্রুত উপরে উঠে আসতে হবে।

ভূমিকম্প পরবর্তী করণীয়ঃ

১.বারবার ব্যবহার করে মোবাইল ফোনের চার্জ নষ্ট করবেন না। ২. বড় ভারী কোন কিছুর নিচে চাপ পড়লে অযথা টানা হ্যাঁচড়া করবেন না। তা নাহলে শরীরের শক্তি নিঃশেষিত হবে। ৩. বড় ভূমিকম্পের পর আবার আফটার শক অনুভূত হয়। তাই তাতক্ষণিকভাবে ঘরে প্রবেশ করবেন না। মনে রাখবেন প্রথমবারের আঘাতের চেয়ে আফটার শকের তীব্রতা কম হলেও তা খুব বিপদজনক। কারন প্রথম আঘাতে ভবনের ভিত্তি দূর্বল হয়ে পড়ে। তাই আফটার শকের সময় সেই দূর্বল ভবন ভেঙ্গে পড়তে পারে। ৪. ফাটল ধরা কোন ভবনে কোনভাবেই প্রবেশ করবেন না। ৫. সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে রেডিও ও অন্য বেতার বার্তা শুনার চেষ্টা করবেন। ৬. জরুরী বাহিনীকে (যেমনঃ ফায়ার সার্ভিস, এম্বুলেন্স) দ্রুত খবর দেওয়ার চেষ্টা করবেন। ৭. উদ্ধারকর্মীদের উদ্ধার কাজে সর্বাত্বক সহযোগীতা করতে হবে। মনে রাখবেন আপনার এলাকার অলি-গলি আপনিই ভালো চিনেন। ৮. কোন ভবনে আটকা পড়লে আপনার কন্ঠ যদি উদ্ধারকর্মী পর্যন্ত না পৌছায় তবে শক্ত কিছুতে আঘাত করুন। ৯. আর সবচেয়ে বড় কথা মনোবল হারাবেন না একদম।

পৃথিবীর সমস্ত কিছু একদিন ধ্বংস হবে এটা অনিবার্য সত্য। তাই হয়তো কবি সকাল রয় আজকের এই ভূমিকম্পনের অনুভূতি তার কবিতায় আচর তুলে বলেছেন, একদিন ধ্বংস হবে জেনেও জন্ম দেই আরও একটা কবিতার! আরও একটা শব্দ দানব, এক টুকরো বিরক্তি! এক-আধটা খিস্তি! এক চিমটি আবেগ। আরও একটা কবিতা পুড়িয়ে দেয় সময়কে! এ কবিতা কালজয়ী নয়, এ শুধু অনুভূতির অপচয়।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com