আজ শুক্রবার, ৭ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং, ১লা মুহাররম, ১৪৩৯ হিজরী, শরৎকাল, সময়ঃ বিকাল ৫:৫৩ মিনিট | Bangla Font Converter | লাইভ ক্রিকেট

ফেসবুকে প্রকাশিত কবিতা /২০১৫ : একটি পর্যবেক্ষণ

আবুল কাইয়ুম #

১. প্রতিষ্ঠিত কবি বা বেশ ভালো লেখেন এমন কবির সংখ্যা ফেসবুকে খুবই অল্প। মোটামুটি চলনসই বা পাঠযোগ্য কবিতা লেখেন এমন কবি অনেকেই আছেন। তবে এখানে দুর্বল কবিরাই সংখ্যাগুরু।

২. বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সমাজ উন্নয়নের অবশ্যম্ভাবী প্রতিফলন হিসেবে বুদ্ধি ও যুক্তির যে বিকাশ বাঞ্ছনীয় সেটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করা যায়নি। অগ্রসরমান আধুনিকতার প্রভাবে মানুষের জীবনযাত্রার প্যাটার্ন যেভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে তারও প্রতিফলন কবিতায় খুব একটা পড়েনি। অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া আধুনিক মননের পরিচয়বহ কবিতা বেশি একটা দেখা যায় না।

৩. কবিতায় নিসর্গচিত্র ব্যবহার প্রতিনিয়ত দৃশ্যমান হলেও মিথ, ইতিহাস-ঐতিহ্য, লোকশিল্প, আন্তর্জাতিকতা, বিজ্ঞান ইত্যাদি থেকে অনুষঙ্গ আহরণের প্রবণতা খুব বেশি দেখা যায় না।

৪. দেশ ও সমাজের দারিদ্র্য, অশিক্ষা-কুশিক্ষা, জরা-গ্লানি, হত্যা-সন্ত্রাস, শোষণ-নির্যাতন, দমন-পীড়ন, মাড়ী-মড়ক, লুন্ঠন-দস্যুতা, দুর্নীতি-রাহাজানি, অশ্লীলতা, অপসংস্কৃতি, পরিবেশ দূষণ, অধিকারহীনতা, অপরাজনীতি, অপশাসন, ধর্ম বর্ণ লিঙ্গ ইত্যাদি ক্ষেত্রে বৈষম্য, দুর্যোগ দুর্ঘটনা অপঘাত ইত্যাদি দুরবস্থা কবিদের লেখার অনুষঙ্গ হতে পারে। এই বিষয়গুলো নিয়ে লেখনী ধারণ করেছেন – এমন কবিরা ফেসবুকে সংখ্যালঘু।

৫. প্রেম কবিতার একটি মুখ্য উপজীব্য। সকল কবিই প্রেমের কবিতা লেখেন বা লিখবেন –এটাই কাম্য। তবে ফেসবুকে বেশ কিছু কবির ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, তাঁরা প্রতিটি কবিতাতেই নানা বাক্যে এক দয়িত/দয়িতাকে হারাবার বেদনা কিংবা তাকে পাবার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করে যাচ্ছেন। তাঁদের কবিতা পড়লে মনে হয়, তাঁরা যেন সর্বদা একটি কবিতাই লিখে যাচ্ছেন।

৬. পৃথিবীর নানা দেশে যুদ্ধবিরোধী কবিতা লেখার প্রবণতা সর্বদাই ছিল, এখনও আছে। আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠিত নবীন-প্রবীণ কবিদের অনেকেই শান্তির সপক্ষে যুদ্ধের বিরুদ্ধে কলম ধারণ করেছেন। কিন্তু ফেসবুকে এ ধরণের কবিতা অল্পই পাওয়া যাবে।

৭. প্রায়শ কবিরা নিজের কথাই বলতে চেয়েছেন, নিজেকেই নানা কথায় কবিতার মূল চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এটি খারাপ নয়, তবে নিজেকে অন্যদের প্রতিনিধিত্বশীল করার মধ্যেই সার্থকতা। অনেক ক্ষেত্রেই একজনের ‘আমি’তে অপরের ‘আমি’ বা সাধারণ ‘আমি’র প্রতিফলন ঘটেনি।

৮. যাঁরা পদ্য লেখেন তাঁদের অনেকেই (সবাই নন) চরণের শেষে অন্ত্যমিল দিয়ে লিখলেও চরণগুলোতে ছন্দশাস্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী মধ্যবর্তী পর্ব বিন্যাস করা থেকে বিরত থাকেন। এসব লেখকদের অনেকে হয়তো অন্ত্যমিলকেই ছন্দ মনে করেন। এর ফলে পদ্যে যথাযথ তাল, লয় ও ঝঙ্কার ফুটে ওঠে না। আবার ঋদ্ধ ও চিত্রল ভাষায় লেখা আপন ছন্দের পংক্তিতে সচেতনভাবে অন্ত্যমিল দিয়েও অনেকে সুন্দর কবিতা লিখেছেন -এটিও সত্যি।

৯. অনেকে আধুনিক কবিতার মতো লাইন সাজিয়ে আবেগের স্ফূরণ ঘটাতে চাইলেও চিত্রকল্পের অভাব বা দুর্বলতার কারণে তা অনেকাংশে ব্যাহত হয়।

১০. কিছু কিছু কবির কবিতা অন্যদের দ্বারা প্রভাবিত মনে হয়। এমনও দৃ’একজনকে দেখেছি যাঁদের কবিতার মেৌলিকত্ব প্রশ্নাতীত নয়। এমন কবিতাও দেখা গেছে -যা পঞ্চাশ বা ষাট দশকের কোনো কবির একটি কবিতার ছকের অনুকরণ।

১১. দুর্বল ভাষা, অশুদ্ধ বানান, ভুল শব্দ বা ভুল বাক্য সহকারে লিখে যাচ্ছেন এমন লেখকদের সংখ্যাও প্রচুর। অনেকেই প্রমিত বানান-রীতি অনুসরণ করেন না। তবে উল্লেখযোগ্য-সংখ্যক কবি ভাষা ও বানানের শুদ্ধতা চর্চায় নিয়োজিত আছেন -এটিও দৃশ্যমান।

১২. পরিশেষে উল্লেখ্য, ফেসবুকের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক তরুণ-তরুণী কবিতা-সাহিত্যের চর্চা ও প্রকাশে এগিয়ে এসেছেন, কিন্তু উৎসাহদানের পাশাপাশি তাঁদের লেখার গঠনমূলক আলোচনা খুব একটা পরিলক্ষিত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে উৎসাহদান শুধু লাইক দেওয়া বা মূল্যায়নহীন/স্তুতিমূলক কমেন্টের মধ্যে সীমিত ছিল।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com