সত্যি রাজা || দীপু মাহমুদ

২৬ বার পঠিত

আজিজ স্যার চেয়ারে বসে আছেন টানটান হয়ে। তিনি তাকিয়ে আছেন ক্লাসের ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে। পল্টু ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে চক। সে চক হাতে নিয়ে ঘোরাচ্ছে। হাত ঘেমে চক ভিজে গেছে। স্যার ইংরেজিতে মাউথ বানান লিখতে বলেছেন। বানান মনে আসছে না।

কেউ কোনোদিন আজিজ স্যারকে হাসতে দেখেনি। তিনি গম্ভীর মানুষ। একদিন আজিজ স্যার টিচার্স রুমে বসেছিলেন। পন্ডিত স্যার এসে বসলেন সামনে। হাসতে হাসতে বললেন, আজিজ সাহেব, রামগরুড়ের ছানা বলেন আর ছানাপোনার পিতাই বলেন সেটা হচ্ছে সুকুমার রায়ের পদ্য। বাস্তবে রামগরুড় বলে কিছু নেই।

আজিজ স্যার স্থির চোখে তাকালেন পন্ডিত স্যারের দিকে। তার মুখ শুকনো। তিনি গম্ভীর গলায় বললেন, মানে কি?

পন্ডিত স্যার বললেন, রামগরুড়ের ছানা, হাসতে তাদের মানা। হাসির কথা শুনলে বলে, হাসব না-না, না-না।

আজিজ স্যার শুকনো মুখে বললেন, এই কথা আমাকে কেন বলছেন?

পন্ডিত স্যার বললেন, সব সময় মুখ রামগরুড়ের মতো হাড়িপানা করে রাখেন কেন? ইশকুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা আপনাকে ভয় পায়। ওদের সাথে হাসবেন। হেসে হেসে কথা বলবেন।

আজিজ স্যার উঠে গেলেন। যেতে যেতে বললেন, শুধু শুধু হাসতে আমার ভালো লাগে না।

পল্টুর পায়ে তোবড়ানো বেঢপ জুতো। দেখে মনে হচ্ছে এই জুতো পরে সে মাঠে লাঙল দিতে গিয়েছিল। পল্টু এক পা দিয়ে আরেক পা ডলছে। তার মনে হচ্ছে সে পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। যেকোনো সময় ঠাস করে পড়ে যাবে। মাথায় মাউথ বানান ঘুরছে, এম-এ, মা। ইউ-টি-এইচ, উথ। বানানে কোথাও একটা ভুল হয়েছে। কি ভুল হয়েছে সেটা ধরতে পারছে না।

ভেজা চকের গুঁড়ো পল্টুর হাতের নখে জমা হচ্ছে। সে নখ দিয়ে চক খুঁটছে। আজিজ স্যার এখন তাকে হাত পাততে বলবেন। পল্টু টেবিলের ওপর চক রেখে স্যারের সামনে হাত পেতে দাঁড়াবে। আজিজ স্যার টেবিলের ওপর থেকে বেত তুলে নিয়ে সপাৎ সপাৎ করে দুইবার মারবেন। পল্টুর চোখ ফেটে পানি এলেও সে হাত টেনে নেবে না। তার শাস্তি পাওয়া দরকার। সে মাউথ বানান মনে করতে পারছে না।

সবাই সবকিছু পারে। শুধু পল্টু পারে না। স্যার পড়া জিজ্ঞেস করলে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তার সব তালগোল পাকিয়ে যায়। এ রকম যে সব সময় হয় তা কিন্তু না। তাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, পল্টু এখন শালুক পাওয়া যাবে কোন বিলে? সে ঠিক বলে দেবে। একটুও ঘাবড়াবে না।

কোন গাছে টিয়া পাখির বাসা আছে। কোন মাসে ছাতিম ফুল ফোটে তা সে জানে। শুধু ক্লাসে স্যার পড়া জিজ্ঞেস করলে ওর মাথা তখন আর কাজ করে না। অংক ক্লাসে চৌধুরি স্যার এসে ওকে শাস্তি দেন। টেবিলের নিচে মাথা ঢুকিয়ে উবু হয়ে থাকতে বলেন। কোনোদিন সে একটা অংকও ঠিকমতো করতে পারে না। শওকত স্যার বাংলা পড়াতে এসে বলেন, পল্টু দাঁড়া।

পল্টু উঠে দাঁড়ায়। সে সব সময় বসে ক্লাসে সবার পেছনে। সামনের ছেলেদের মাথায় তার মুখ ঢেকে থাকে। দরকার হলে সে সামনের ছেলেটার মাথার পেছনে নিজের মাথা লুকিয়ে রাখে। সামনের ছেলেটি মাথা ডানদিকে সরালে সেও তার মাথা ডান দিকে সরায়। বামে সরালে সেও বামে সরায়। আচমকা স্যারের চোখে চোখ পড়ে গেলে মেঝেতে হাতের পেন্সিল ফেলে দেয়। মাথা নিচু করে সেই পেন্সিল তোলে অনেক সময় নিয়ে।

তবু সব স্যার তাকে দেখে ফেলেন। শওকত স্যার বলেন, বই খোল। আট পাতার প্রথম থেকে পড়তে থাক। গড়গড় করে পড়ে যাবি।

পল্টু পড়া শুরু করে। গড়গড় করে পড়তে পারে না। তার পড়া আটকে যায়। শওকত স্যার তাকে কাছে ডাকেন। কাছে ডেকে ক্লাসের বাইরে পাঠিয়ে দেন। দরজার বাইরে ইট রাখা থাকে। সেই ইট হাতে নিয়ে পুরোটা ক্লাসের সময় সূর্যের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।

পড়াশুনা একদম মাথায় ঢোকে না পল্টুর। ইশকুল ভালো লাগে না। তার ইচ্ছা সে রাজা হবে। মলিন স্যার বলেছেন, পড়াশুনা না করলে রাজা হওয়া যায় না।

মলিন স্যারকে পছন্দ করে পল্টু। স্যার রাজার গল্প শোনান। ভালো রাজার গল্প। সেই সব রাজা দুষ্টু লোকদের সাথে যুদ্ধ করত। তবে কখনো মানুষকে অত্যাচার করত না। মানুষের কিসে ভালো হবে সেই কথা ভাবত। পল্টু সেই রকম রাজা হতে চায়। ভালো রাজা। সে মানুষের উপকার করবে। কাউকে কষ্ট দেবে না।

পড়াশুনা করে রাজা হবে বলে পল্টু প্রতিদিন ইশকুলে আসে। কেউ তার কথা শুনতে চায় না। শুধু মলিন স্যার শোনেন। সবাই ওর কথা শুনে হাসে আর ঠাট্টা করে।

মানিক একদিন একজোড়া তোবড়ানো জুতো নিয়ে এলো। পল্টুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, পরে নে।

এই জুতো পল্টু কেন পরবে বুঝতে পারছে না। সে তাকিয়ে আছে মানিকের দিকে। মানিক হাসছে। হেসে হেসে বলল, তোর জন্যে বাবার কাছ থেকে চেয়ে এনেছি।

পল্টুর জুতো পায়ে দেয়ার ইচ্ছে অনেকদিনের। রাজা কি আর খালি পায়ে হাঁটে! তার পায়ে জুতো থাকতে হবে। গায়ে থাকবে রাজার পোশাক। মাকে বলেছিল রাজার পোশাক বানিয়ে দিতে। মা বললেন, তোর ঘাড় থেকে যদি ওই রাজার ভূত না নামে তাহলে তোর ভাত বন্ধ।

মানিকের দেয়া জুতো সে পায়ে দিল। পায়ের মাপের থেকে অনেক বড় জুতো। হলহল করছে। তবু মানিক বলল, তোকে মানিয়েছে দারুণ। ছবিতে তো দেখেছিস, কত বড় হয় রাজাদের পায়ের নাগরা।

মানিক যে তাকে নিয়ে ঠাট্টা করছে সেটা বুঝতে পারে পল্টু। প্রথমে একটু কষ্ট হয়, তবু মেনে নেয়। সে ওই জুতো পায়ে ইশকুলে আসতে আরম্ভ করে। সবাই ওকে নিয়ে হাসাহাসি করলেও পল্টু কিছু বলে না। চুপ করে থাকে। একসময় কেউ আর হাসাহাসি করে না। পল্টু তোবড়ানো বেঢপ জুতো পায়ে ঘুরে বেড়ায়।

আজিজ স্যার টেবিলের ওপর থেকে বেত তুলে নিয়েছেন। পল্টুর ডান হাতের তালু শিরশির করছে। এখন তাকে ডান হাতের তালু স্যারের সামনে পেতে দিতে হবে। স্যার সেখানে বেত মারবেন।

আজিজ স্যার পল্টুকে মারলেন না। বেত দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ড দেখালেন। বললেন, লেখ এম।

পল্টুর হাত কাঁপছে। হাতের ভেতর এঁটে আছে চক। পড়ে যেতে পারে।

স্যার বললেন, লেখ এম-ও।

ইংরেজিতে মাউথ বানান মনে পড়ে গেছে পল্টুর। সে লিখল, এম-ও-ইউ-টি-এইচ।

আজিজ স্যার বললেন, গুড। ভেরি গুড।

ইশকুল থেকে বের হয়ে পল্টু গেল কাজলা নদীর বাগানে। এদিকটাতে অনেক জঙ্গল। ডোবামতো গর্ত আছে কতগুলো। তার ভেতর কাঁটাওয়ালা বেতঝোপ। ওপাশে নদী ছিল একসময়। সেই নদীর নাম ছিল কাজলা। নদী শুকিয়ে সরু হয়ে গেছে। তবে তার পানি এখনো ঝকঝকে। সূর্যের আলো পড়লে নিচ পর্যন্ত দেখা যায়।

বেতঝোপের ওপাশে চিকন লম্বা গাছের সারি। আর আছে পুরোনো একটা বটগাছ। এই ঝোপ জঙ্গলে অনেক শিয়াল থাকে। দিনের বেলাতেও তাই এদিকে কেউ আসে না।

শিয়াল ভয় পায় না পল্টু। সে এখানে এসে রাজা সাজে। আজ সকালে ইশকুল যাওয়ার সময় রমজান চাচার দোকানে গিয়েছিল। চাচার কাছ থেকে পাউডার চেয়ে নিয়েছে। সেই পাউডার কাগজে মুড়ে পকেটে রেখেছে।

পাউডার মুখে মেখে ফরসা হবে। পল্টু শুনেছে রাজা হয় দুধের মতো ধবধবে ফরসা। মাথায় থাকে মুকুট।

সে বটের পাতা দিয়ে মুকুট বানিয়ে মাথায় পরবে। সেই মুকুট মাথায় দিয়ে পল্টু যাবে নদীর ধারে। সরু নদীর ঝকঝকে পানিতে নিজেকে দেখবে। সে দেখবে এক রাজা তাকিয়ে আছে তার দিকে। পল্টু সেই রাজার দিকে তাকিয়ে বলবে, তোমার রাজ্য চলে কেমন?

রাজা বলবে, ভালো। তবে ইশকুলের ছেলেগুলো খুব দুষ্টু। আমাকে নিয়ে শুধু তামাশা করে।

পল্টু বলবে, ওদের ধরে খুব করে শাস্তি দাও। শুলের নাম শুনেছ? ওদের শুলে চড়াও।

পল্টু নিজে শুলের নাম শুনেছে বটে। তবে শুলে কেমন করে চড়াতে হয় জানে না। শুল দেখতে কেমন সেই ধারণাও তার নেই।

রাজা বলে, না-না। কাউকে শাস্তি দেয়া একদম ভালো না। ওরা আমার বন্ধু। আমরা সবাই সবাইকে ভালোবাসি।

কিছুক্ষণ পানির দিকে তাকিয়ে থাকবে। তারপর নদীর পানিতে মুখ ধুয়ে, মাথার মুকুট নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে পল্টু বাড়ি ফিরে যাবে।

আজ পানির দিকে তাকিয়ে মন খারাপ হয়ে গেল পল্টুর। পাউডার মেখে তাকে দেখাচ্ছে শাদা ভূতের মতো।

পল্টু বলল, রাজা তোমার খবর কি?

নদীর পানির ভেতর থেকে রাজা বলল, রাজা বলছিস কেন? বল, এই ভূত তোর খবর কি?

তখন পেছনের জঙ্গল থেকে ছোট বাচ্চার চিৎকার শুনতে পেল। ঝট করে উঠে পড়ল পল্টু। ছুটে গেল বেতঝোপের ওপাশে। ওখানে গিয়ে মনে হলো শরীরের সব রক্ত ঠান্ডা হয়ে গেছে। ভয়ে আঁতকে উঠল।

অন্তু দাঁড়িয়ে আছে ঝোপের ভেতর। অন্তু ওদের ইশকুলে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। দুটো শিয়াল দুইপাশ থেকে আটকে রেখেছে তাকে। অন্তু চেঁচাচ্ছে।

পল্টু উবু হলো। পায়ের কাছে গাছের ডাল পড়ে আছে। সেই ডাল হাতে তুলে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার মাথা থেকে খসে পড়ল বটের পাতার মুকুট। শিয়ালদুটো তেড়ে এলো ওর দিকে। হাতের লাঠি দিয়ে খুব মারল শিয়ালদুটোকে। একটা শিয়ালকে পা দিয়ে ধাক্কা দিতে গিয়ে শিয়াল পল্টুর পা কামড়ে ধরল। ওর পায়ে ভারী জুতো ছিল বলে কিছু হলো না। ঝটকা দিয়ে পা সরিয়ে নিল। হাতের লম্বা লাঠি দিয়ে আবার মারল শিয়ালকে। ভীষণ যুদ্ধ হলো। দুষ্টু শিয়ালেরা হেরে গেল পল্টুর কাছে। ওরা ছুটে পালিয়ে গেল জঙ্গলের ভেতর।

অন্তুকে খুঁজতে এসেছিল ওর মেজো মামা। এসে দেখে পল্টু লম্বা লাঠি নিয়ে শিয়াল পেঠাচ্ছে। পরেরদিন মেজো মামা ইশকুলে গিয়ে সবাইকে ডেকে ডেকে বলল সেই ঘটনা। পল্টু কেমন করে বাঁচাল অন্তুকে।

সবাই খুব বাহবা দিল। মলিন স্যার বুকে জড়িয়ে ধরলেন। আজিজ স্যার, চৌধুরি স্যার, শওকত স্যার খুব আদর করলেন। সবচেয়ে বেশি আদর করলেন হেড স্যার।

পল্টুর মা এসেছেন ইশকুলে। তিনি হেড স্যারের কাছে আবদার নিয়ে এসেছেন। হেড স্যার বললেন, বলেন কি আবদার আপনার।

মা বললেন, পল্টু যেদিন ইশকুল থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিতে যাবে সেদিন আমি তাকে রাজার পোশাক পরিয়ে দেব। মাস্টার সাহেব, আপনি একটা ঘোড়ার ব্যবস্থা করবেন। পল্টু ঘোড়ায় চড়ে পরীক্ষা দিতে যাবে।

পল্টুর মায়ের কথা শুনে হেড স্যার আনন্দ পেলেন। তিনি বললেন, অবশ্যই পল্টু ঘোড়ায় চড়ে পরীক্ষা দিতে যাবে। আমি নিজে ওর জন্য ঘোড়া আনানোর ব্যবস্থা করব।

পল্টুর মা কাঁদছেন। তিনি শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ চেপে ধরেছেন। তার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে। তিনি কাঁদছেন আনন্দে। পল্টু আজ একজন মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে। সবাই তার প্রশংসা করছে। সে ভালো কাজ করে সত্যিকারের রাজা হয়েছে।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com