সহোদর ।। দীপু মাহমুদ

৮৯ বার পঠিত

হাওরের নাম কাইল্যাগুটা। সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার, চরনারচর ইউনিয়নকে বেষ্টন করে আছে এই বিশাল হাওর। যতদূর চোখ যায় পানি আর পানি। ঝকঝকে সেই পানির ভেতর দিয়ে হাওরের তল দেখা যায়। একেই বুঝি বলে কাকচক্ষু জল। হাওরের সেই স্বচ্ছ পানিতে রোদ্দুর ঝিলিক দেয়। পানির নিচে আন্দোলিত লতাগুল্ম স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ছোট ছোট হাওরিয়া সাদা জিনারি ফুল ভাসে পানিতে। হাওরে আরও আছে শালুক, কলমী, পাউরা আর এড়াইল। প্রচুর শাপলা ফোটে। অনেকগুলো বেশ বড়। লাল শাপলা। স্থানীয় মানুষেরা বলেন হাপলা। বেলা বাড়লে তা পানির তিরতিরে ঢেউয়ে মধুমাধবী কি ভুপালী রাগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচতে থাকে। এই হাওরে যখন দমকা বাতাস ওঠে বদলে যায় হাওরের চেহারা। পানির গভীরতা খুব বেশি না। আট দশ হাত। সেখানে বড় বড় ভয়ংকর ঢেউ ওঠে। হাওরের মাঝে সেই প্রবল বাতাসকে স্থানীয় মানুষেরা বলে আফাল।

এনতাজ আলি যখন কল্যাণী নদীর পাড়ে এসে দাঁড়িয়েছে তখন প্রচন্ড বাতাসে বড় বড় ঢেউ উঠেছে পানিতে। ঘাটে একটা নৌকা বাঁধা। নৌকাভর্তি পারের যাত্রী। মাঝি আকাশের ভাবগতিক বোঝার চেষ্টা করছে। কাইলানী (কল্যাণী) থেকে নৌকা যাবে কাইল্যাগুটা হাওরের ওপর দিয়ে চরনারচর। এনতাজ আলির গন্তব্য সেখানেই। আকাশে মেঘ নেই। বৃষ্টি নেই। শুধু প্রবল বাতাস। দুলাল মেম্বার নৌকার ছৈয়ের নিচে কাঠের পাটাতনে শুয়ে ছিল টান হয়ে। তন্দ্রামতো এসেছিল। নৌকার আচমকা দুলুনিতে নড়ে উঠে বলল, বাতাসের গতিক কী বোঝ?

মাঝি গলুইয়ের উপর নির্বিকারভাবে বসে দাঁত খিলান করতে করতে উত্তর দেয়, বাসাতের গতিক বালা না মেম্বার। এনতাজ আলি মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকায়। আকাশে হালকা মেঘ জমতে শুরু করেছে। তবে বাতাসটাই বেশি। বাতাস ঠান্ডা মনে হয়। এখন আর বাতাস ক্ষণে ক্ষণে দিক পরিবর্তন করছে না। একদিক থেকে বইছে। মানে দূরে কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে। তখনই ঝমঝম করে বৃষ্টি নেমে আসে। ঝড়ো হাওয়া থেমে গেছে।

মাঝি ঘাড়ে ঝোলানো গামছা মাথায় পেঁচিয়ে নেয়। বলে, নাও ছাড়ি দিমু। এনতাজ আলি এই সময়ের অপেক্ষায় ছিল। ঠিক যখন নৌকা ছাড়বে তখন ছুটে গিয়ে উঠে পড়বে নৌকায়। নাহলে আগে উঠলে কেউ হয়তো জোর করে নামিয়ে দিতে পারে। এনতাজ আলি জানে, কুকুরকে তাও পা দিয়ে আদর সোহাগ করা যায়। সুইপারের ছোঁয়া বাঁচিয়ে চলতে হয় সব সময়। ওরা পথের কুকুরের চাইতেও অধম।

মাঝির সঙ্গে অল্প বয়সী যে ছেলেটা আছে সে ইঞ্জিনে পানি দেয়। হ্যান্ডেল ঢুকিয়ে মোচড় দিয়ে ঘোরাতে থাকে। ভট ভট করে স্টার্ট নেয় ইঞ্জিন। বগ বগ করে কালো ধোঁয়া ছাড়ে। এনতাজ আলি ছুটে আসে নৌকায়। লাফ দিয়ে উঠতে গিয়ে চোখাচোখি হয় দুলাল মেম্বারের সঙ্গে। মেম্বারের চোখ সরু হয়ে আসে। নৌকা থেকে নেমে পড়ে এনতাজ আলি। মাঝি জিজ্ঞেস করে, কিতাবা। কিতা ওইল? নামি গেলাই কেনে? এনতাজ আলি দুলাল মেম্বারের দিকে তাকিয়ে বলে, আফার্ল‌ গাং পারি দিতাম নায়।

ছড়ানো ডালপালা মেলে হাওরের পানির ওপর বেড়ে উঠেছে বরুন গাছ। গাছের ডালে শিশু কিশোররা পা ঝুলিয়ে বসে আছে। ঝাঁপিয়ে পড়ছে হাওরের পানিতে। মনির শক্ত করে চেপে ধরে আছে গাছের একটা ডাল। বাপ্পি, গৌর, সুজিত, পলান, ফারুক সবাই গাছের ডাল দুলিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে পানিতে। সাঁতরে ডাঙ্গায় উঠে আবার গাছে চড়েছে বাপ্পি গৌররা। মনির একটা বড় ডালে বসে গাছের আরেকটা সরু ডাল চেপে ধরে আছে। আর সবার মতো পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছে, কিন্তু ভয়ে পারছে না।

মনিরের এক হাত ধরে হ্যাচকা টান দিয়ে জাকির বলে, দে লাফ দে।
ভয়ে চিৎকার করে ওঠে মনির, না। আমি লাফ দেব না।
জাকির লাফিয়ে পড়ে পানিতে। সবাই মনিরকে নিয়ে হাসাহাসি করে। বলে, তুই একটা ডরালু। কাপুরুষ। সাহস নেই তোর।
চোখ ফেটে কান্না আসে মনিরের। জাকির আর মনির পিঠাপিঠি দুই ভাই। মনিরের চেয়ে বছর তিন কি চারের বড় জাকির। মনিরের দশ বছরের এই ছোট্ট জীবনে আর কারও অপমান যত না ওকে কষ্ট দিয়েছে তারচেয়ে অনেক বেশি কষ্ট দিয়েছে ওর আপন বড় ভাই জাকিরের অপমান। বুকের ভেতর থেকে কষ্টের দলা ঠেলে উঠে গলার ভেতর আটকে যায়। আর যে যা বলে বলুক, জাকির কেন তাকে ডরালু, কাপুরুষ বলে গালাগালি করবে। বাড়ি থেকে বেরুনোর সময় মনিরকে জাকির বলেছিল, নদীর ঘাটে যাবি? বাবা ফিরবে দেখিস। বাবার কথা শুনে জাকিরের পায়ে পায়ে নদীর ঘাটে চলে আসে মনির। জাকির বরুন গাছটা দেখিয়ে বলে, নে উঠে পড়। বাবার নৌকা দেখা যাবে।

গাছে উঠতে ভয় পায় মনির। তবুও বাবাকে দেখা যাবে শুনে রাজি হয়। জাকির ওকে সাহায্য করে গাছে চড়তে। নদীর ঘাটে বসে থাকা গৌর, বাপ্পি, সুজিতরাও গায়ের জামা গেঞ্জি খুলে তরতর করে উঠে পড়ে গাছে। মনিরকে গাছে তুলে জোরে জোরে ডাল ঝাঁকাতে থাকে। মনির ভয়ে যত জোরে চিৎকার দেয়, জাকির তত জোরে গাছের ডাল ঝাঁকায়। মনির চোখ বন্ধ করে শক্ত হাতে সরু একটা ডাল আঁকড়ে ধরে। বাপ্পি সুজিতরা তখন গাছের অন্যান্য ডালে চড়ে লাফায়। পুরো গাছ দুলতে থাকে। তীব্র আতঙ্কে চোখ বন্ধ করে চিৎকার করে যায় মনির। ওর এই অবস্থা দেখে গৌর, পলান, জাকির, বাপ্পিরা হাসতে হাসতে পানিতে লাফিয়ে পড়ে।

নৌকার ইঞ্জিনের ভট ভট শব্দ শুনে চোখ খুলে তাকায় মনির। সাবধানে অতি সন্তর্পনে গাছের একটা ডাল শক্ত করে চেপে ধরে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ায়। পায়ের সবগুলো আঙ্গুল গুটিয়ে খামচি দিয়ে পাখির মতো করে পায়ের নিচের ডালটা আঁকড়ে ধরে। নৌকাঘাটায় এসে নৌকা থামে। মনির সাবধানে শরীর বেশি না বাঁকিয়ে ইতিউতি তাকিয়ে নৌকাঘাটায় বাবাকে খোঁজে। বাবার দেখা পেলে এখান থেকে জোরে চিৎকার দেবে। বাবা এসে ওকে গাছ থেকে নামিয়ে বাড়ি নিয়ে যাবে। মনির দেখে দুলাল মেম্বার নামছে নৌকা থেকে। বাবা নামে না।

জাকিররা আবার লাফাতে লাফাতে উঠে আসে গাছে। গাছ দুলে ওঠে। ঝপ করে পানিতে পড়ে যায় মনির। ইঞ্জিনের নৌকা চলে গেলে সেখানে পানি ভাগ হয়ে দুই পাশে সরে গিয়ে আলোড়ন ওঠা চওড়া দাগ থেকে যায়। সেই ভাগ হয়ে যাওয়া পানির ভেতর পড়ে যায় মনির। দুই পাশ থেকে পানি গড়িয়ে এসে মনিরের মাথার ওপর ফাঁকা জায়গা ভরে দেয়। পানিতে প্রবল মাতন তুলে হাত-পা ছুঁড়তে থাকে মনির। জাকিররা তখন টের পায় মনির পানিতে পড়ে গেছে। ওরা লাফ দেয়। ডুব দিয়ে খুঁজতে থাকে মনিরকে। পানিতে বড় বড় বুদবুদ তুলে ডুবে যায় মনির।

জাকির পানি থেকে মনিরকে টেনে তোলে ডাঙায়। মনির ভয়ে সিঁটিয়ে গেছে তখন। ঘন ঘন নিঃশ্বাস পড়ছে। নীল হয়ে গেছে ওর শরীর। দুই হাত মুঠো করে বুকে চেপে ধরে ঠকঠক করে কাঁপছে। মরে যে যায়নি মনির, বেঁচে আছে দেখে স্বস্তির শ্বাস ফেলে জাকির। মনিরের মাথায় জোরে চাঁটি মেরে বলে, যা বাড়ি যা। ডরালুর ডিম একটা। সাহস নেই এক ছটাক। মুরগির কলিজা।

কাঁদতে কাঁদতে ভেজা গায়ে বাড়ির পথ ধরে মনির। মনে মনে ফুঁসতে থাকে, বাড়ি গিয়ে মাকে সব বলে দেবে। মা অবশ্যই ভাইকে খুব শাস্তি দেবে। ভাবে, ওর শাস্তি পাওয়া উচিত। কঠিন শাস্তি। যেন আর কোনোও দিন ওর সঙ্গে এই রকম খারাপ ব্যবহার করার সাহস না পায়। সারাটা পথ অঝোরে কাঁদে। নাক দিয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস টেনে, ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদে। যতবার ঠোঁট ফুলিয়ে নাক দিয়ে বাতাস টানে ততবার বুক চেপে আসে কষ্টে। চোখ দিয়ে দরদর করে পানি বেরিয়ে আসে।

স্কুল মাঠে এসে মনিরের কান্না থেমে যায়। চরনারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন মাউতি পাড়ায় থাকে ওরা। হাওরের মানুষ এইরকম পাড়াকে বলে আটি। বর্ষার সময় পাহাড় থেকে নেমে আসা পানিতে যখন হাওর তলিয়ে যায় তখন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এক আটি থেকে আরেক আটি। ওই মাউতি আটিতে মনিরদের বাড়ি। এই পথে বাড়ি যেতে স্কুল মাঠ পেরিয়ে যেতে হয়।

স্কুলের সঙ্গে চরনারচর ইউনিয়ন পরিষদ অফিস লাগোয়া। পরিষদের বারান্দায় দুলাল মেম্বার দাঁড়িয়ে আছে। মনির ভাবে, মেম্বারকে গিয়ে জিজ্ঞেস করবে না কি বাবার কথা! ওই একই নৌকাতে তো বাবারও আসার কথা ছিল। মেম্বারের সঙ্গে বাবার দেখা হয়েছিল কি না! সাহসে কুলায় না। মেম্বারকে আর বাবার কথা জিজ্ঞেস করা হয় না। মনির স্কুল মাঠে দাঁড়িয়ে দেখে ওর বয়সী ছেলেমেয়েরা বইখাতা নিয়ে হৈচৈ করতে করতে বাড়ির দিকে ছুটছে। মনির জানে দুপুরে ওদের বয়সী ছেলেমেয়েদের ছুটি হয়। বড়দের ক্লাস শুরু হবে এরপর। কেউ কেউ আবার স্কুল বারান্দায়, নাহয় গাছের গোড়ায় বইখাতা রেখে মাঠে নেমে পড়েছে দুপুর রোদে খেলতে।

স্কুলে পড়ার খুব ইচ্ছা মনিরের। সেই ছোটবেলা থেকে। বইখাতা নিয়ে স্কুলে আসবে। সবার সঙ্গে ক্লাসে বসে জোরে জোরে চিৎকার করে পড়া মুখস্ত করবে। একবার মাকে বলেছিল। মা বলল, তোর বাবাকে বল।

মনির বাবাকে গিয়ে ধরল। বাবা ঘরের দাওয়ায় বসে বাঁশ চাঁচছিল। ছেলের কথা শুনে যেন একটু অবাক হলো। বলল, কী বললি?
ইশকুলো ভর্তি করি দাও। মুই ইশকুলো পড়তাম। বলে মনির।

মেজাজ এমনিতেই কী কারণে যেন তেতে ছিল এনতাজ আলির। ছেলের এমন অদ্ভুত কথা শুনে বিস্মিত হওয়ার বদলে তার ব্রহ্মতালু জ্বলে উঠল। তাদের বংশে কেউ কোনোদিন স্কুলে পড়েনি। তাদের জন্য পড়া বারণ। স্কুল কখনো সুইপারের ছেলেমেয়েদের ভর্তি করে না। তাতে ভদ্রলোকের ছেলেমেয়েরা নাকি স্কুলে আসা বন্ধ করে দেয়। এনতাজ আলি বাঁশ চাঁছা বন্ধ করে হাতের দা তুলে তেড়ে আসে ছেলের দিকে, কাটিয়্যা দুই টুকরা করিয়া কাইল্যা গাংগো ভাসাই দিমু। সাব ওইতাইনানি!নূরজাহান দৌড়ে এসে ছেলেকে বুকের ভেতর টেনে নিয়ে সামলায়। আর কোনোদিন স্কুলে পড়ার কথা বলেনি মনির।

বাড়ি ফিরে মনির ওকে হেনস্তা করার কথা বলতে ভুলে যায়। মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, মা আমি পড়ব। আমাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দাও। নূরজাহান ছেলের কথার কোনো উত্তর না দিয়ে নিজ কাজে মন দেয়। মনির রাগে দুঃখে মাটির দিকে তাকিয়ে ডান পা তুলে উঠোনে তিনবার লাথি দিয়ে মাকে শুনিয়ে বলে, মুই পড়তাম, পড়তাম, পড়তাম।

জাকিরকে বাড়ি ফিরতে দেখে মনিরের আবার মনে পড়ে যায় সব। তাকে পানিতে ফেলে নাস্তানাবুদ করা, বন্ধুদের নিয়ে অপমান করার কথা। মায়ের কাছে নতুন করে কথাগুলো তুলতেই যাচ্ছিল মনির। জাকিরের পিছনে দেখল বাবা দাঁড়িয়ে। বাবার থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে এখন আর কাউকে কিছু বলার সাহস পেল না। নিঃশব্দে ঘরের ভেতর ঢুকে গেল।

রাতে মাকে জড়িয়ে ধরে, মায়ের বুক লেপটে শুয়ে থাকে মনির। বাবা আর জাকির শোয় মেঝেতে। ওদের মাথা বরাবর আড়াআড়ি মাদুর বিছিয়ে। থাকার এই একটা ঘর ওদের। মা ওকে ঘুম পাড়ায়। খুব নিচু সুরে ধামাইল গায়। গানের ছন্দোবদ্ধ সুরের তালে তালে মা ওর শরীরে আলতো করে থাবাতে থাকে। গানের একই লাইন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নতুন করে গায়। মায়ের গানের গলা বেশ সুন্দর। নরম আর মিষ্টি। ভালো লাগে। গায়ে মায়ের হাতের স্পর্শে ছন্দের তাল আর সুরের ভেতর কখন ঘুমিয়ে পড়ে মনির টের পায় না।

জলে গিয়াছিলাম সই
এগো কালা কাজলের মাটি দেইখ্যা আইলাম ওই
জলে গিয়াছিলাম সই
বাড়িতে পালিলাম ময়নায় কত কথা দিয়া
এগো যায়বার কালে নিঠুর ময়না না চাইল ফিরিয়া
জলে গিয়াছিলাম সই

এনতাজ আলি বড় পেরেশানির ভেতর পড়ে যায়। দিশা পায় না কোনো। বড় ছেলের রুক্ষ চুলের ভেতর হাত দিয়ে বলে, বউ! এই কাজ তো আর বালা লাগে নায়।

এই কথা এর আগেও বার কয়েক বলেছে এনতাজ আলি। এর কোনো উত্তর নূরজাহানের জানা নেই। সে তাই নীরব থেকেছে বরাবর। মনিরের গায়ের ওপর নিজের হাতখানা রেখে ভাবে, এই ছেলেকে আমি ওই কাজ করতে দেব না। ওকে আমি স্কুলে পড়াব। পড়াশুনা করে ও একদিন অনেক বড় হবে। সেদিন আমাদের আর কোনো কষ্ট থাকবে না। ঘুমন্ত ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে থাকে নূরজাহান। মুখে কিছু বলে না।

এনতাজ আলি জানে বাপ দাদার এই পেশা ছাড়া অন্য কোনো কাজ করার যোগ্যতা তার নেই। অন্য কোনো কাজ সে শেখেনি, শেখার সুযোগও আসেনি। কল্পনা করে এনতাজ আলি কী ভয়াবহ দিন এসেছিল ওদের পূর্বপুরুষের জীবনে। সুইপার মেথরের কাজ করত হরিজনরা। এই কাজ ছিল তাদের জন্যই নির্দিষ্ট। তারপর এক সময় এই কাজ সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো। সরকারিভাবে ঘোষণা দিয়েই হলো। নোংরা ময়লা পরিষ্কার করার কাজকে আর ছোট কাজ বলে মনে করল না অনেকেই। নিন্মবর্ণের ও অতিদরিদ্র হিন্দু, মুসলমানরা এসে সুইপারের কাজ করতে লাগল। তখন নিশ্চয় দ্বিতীয় কোনো পছন্দ বেছে নেওয়ার সুযোগ তাদের ছিল না। এনতাজ আলির পূর্বপুরুষও শুধু বেঁচে থাকার প্রয়োজনে, জীবিকার তাগিদে এই কাজ বেছে নিয়েছিল। সেই থেকে কয়েক পুরুষ ধরে এনতাজ আলিরা সুইপার। ছেলের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে এনতাজ আলির বুকের ভেতর থেকে গভীর একটা দম আটকানো নিঃশ্বাস বের হয়ে আসে। মনে হয়, তার ছেলেদেরও কি তাচ্ছিল্যপূর্ণ এই মর্যাদাহীন হেয় জীবন বয়ে যেতে হবে!

চৌধুরীদের মসজিদে ফজরের আজান হচ্ছে। মনির চোখ মেলে চাইল। চারপাশে থোক থোক অন্ধকার জমাট বেঁধে আছে। ঘুম জড়িয়ে আছে চোখে, পুরোপুরি কাটেনি। ঘরের ভেতর মৃদু নড়াচড়ার আওয়াজ কানে আসে। মনে হলো কে যেন চুল ধরে টানছে। মনে হতেই ঘুমের ঘোর কেটে গেল। চোখ রগড়াতে রগড়াতে প্রথমেই তাকায় শিয়রের দিকে। বাবা ঘুমাচ্ছে। জাকির বিছানায় নেই। গায়ের ওপর থেকে মায়ের হাতটা সরিয়ে হাতড়ে হাতড়ে বিছানার কোনায় পৌঁছে যায়। কোনো শব্দ না করে বিছানা থেকে নেমে পড়ে মনির। পা টিপে টিপে গুটি গুটি পায়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসে।

আজানের সঙ্গে চরনারচরের আর সব আটির মতো মাউতি আটিও আড়মোড়া ভেঙ্গে জেগে উঠছে। পাতলা অন্ধকারকে সরিয়ে জায়গা করে নেওয়া শান্ত ভোরের আলোয় জাকিরের পথের নিশানা অনুসরণ করে মনির বড় রাস্তার উপর মেড্ডা গাছের কাছে এসে দাঁড়ায়। মনির দেখে সুজিত, গৌর, বাপ্পিরা মেড্ডা গাছের নিচে জাকিরের জন্য অপেক্ষা করছে। গৌর আর বাপ্পির কাছে মাছ ধরার ঠেলাজালি। মনির বোঝে ওরা বিলে যাচ্ছে মাছ ধরতে। শালুক তুলতে। মনির ওদের কাছাকাছি এগিয়ে যায়। ওদের সঙ্গে বিলে যাবে। গৌর ওকে দেখে বলে, কিরে মুরগির কলিজা! তুই এখানে ক্যান?

ঠা ঠা করে বাপ্পি হাসে। বলে, আমাদের সঙ্গে যাবি নাকি? আমরা কোনো ডরালুর ডিমকে সঙ্গে নিই না। জাকিরের দিকে তাকিয়ে বলে, জাকির তুই নিস সঙ্গে? জাকির মনিরের দিকে খেঁকিয়ে ওঠে, যা বাড়ি যা। পিছ পিছ আসছিস কেন? মার আঁচলের নিচে শুয়ে ছিলি শুয়ে থাকগে যা।

রাগ হয় খুব মনিরের। কিছু বলে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। জাকিররা বিলের দিকে এগিয়ে যায়। ওরা এগিয়ে গেলে বেশ খানিকটা দূরত্ব রেখে মনির এগুতে থাকে। বিলের ধারে গিয়ে হিজল গাছের নিচে দাঁড়ায়। জাকিররা ঠেলাজালি নিয়ে বিলে নেমে পড়ে।

পুব আকাশ থেকে আলো ছড়িয়ে পড়ছে। একটু একটু করে ফর্সা হচ্ছে চারপাশ। বিলের ধারে হিজল গাছটা ঘন ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই ডালপালার ফাঁকে ভোরের অন্ধকার জমাট বেঁধে গাছের নিচটাকে আঁধার করে রেখেছে। সেখানে যে মনির ঠায় দাঁড়িয়ে আছে সেটা জাকিররা কেউ ঠাওর করতে পারেনি। প্রথম ওকে নজরে এসেছে সুজিতের। হিজল গাছের তলায় সুজিতের নজর যেতেই সহসা বিলের পানিতে আলোড়ন তুলে ভয় পাওয়া গলায় বলে, ম- ম- মনির নাকি গাছ তলায়!

মনির হিজল গাছের তলা থেকে বেরিয়ে বিলের কিনারে এসে দাঁড়ায়। গৌর উঠে এসে বলে, কিরে তোকে যে নিষেধ করলাম আমাদের সঙ্গে আসতে। কথা শুনলি না? জাকির বিলের ভেতর থেকে উঠে এসে মনিরকে ধাক্কা দিয়ে বলে, ভয়ে তো সিটিয়ে যাস পানিতে পড়ে। বিলে এসেছিস বাহাদুরি দেখাতে? যা বাড়ি যা। কাপুরুষ কোথাকার।

ক্ষেপে যায় মনির, এই খবরদার আমাকে কাপুরুষ বলবি না।
কি করবি বললে, মারবি? কাপুরুষকে কাপুরুষ বলব নাতো কী বলব রে? ডরালু একটা। তেড়ে আসে জাকির।

হিতহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে মনির আচমকা মুই ডরালু নায় বলে ঝাঁপিয়ে পড়ে জাকিরের ওপর। বিলের পানিতে কাদায় মাখামাখি হয়ে দুইভাই মারামারি করে। মনির জাকিরের বুকের ওপর উঠে জাকিরকে ঠেসে ধরে বিলের কাদামাটিতে। আবার জাকির মনিরকে বিলের কাদামাটিতে ঠেসে ধরে খুঁচতে থাকে মাটির ভেতর। মনির এক সময় নিস্তেজ হয়ে এলে ওকে বিলের ধারে কাদামাটির ভেতর ফেলে রেখে জাকিররা আবার সবাই বিলে নেমে পড়ে মাছ ধরতে।

চারপাশ পুরোপুরি ফর্সা হয়ে গেলে মনির বাড়ি ফিরে আসে। বাবা- মাকে খুঁজে পায় ইউনিয়ন পরিষদে। সেখানে লম্বা লাইন। এবার আগাম বন্যা আসায় হাওরের বেশিরভাগ ফসল তলিয়ে গেছে। অভাব ঠেকাতে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দুঃস্থ পরিবারকে চাল দেওয়া হচ্ছে। লম্বা লাইনের পেছনে সবার থেকে একটু দূরত্ব রেখে এনতাজ আলি আর নূরজাহান দাঁড়িয়ে আছে সাহায্যের আশায়। মনির কাদামাটি মাখা গায়ে মায়ের কোল ঘেঁষে দাঁড়ায়। এতবড় লম্বা লাইনে কেন বাবা-মা এসে দাঁড়িয়েছে সেই কথা ভাবতে গিয়ে বিলে মারামারির কথা ভুলে যায়। নূরজাহান ছেলের মাথায় শাড়ির আঁচল তুলে দেয় রোদ থেকে ওকে বাঁচাতে। লাইন শেষ হয়ে ওরা যখন পরিষদের বারান্দার কাছে পৌঁছায় সূর্য তখন মাথার উপর দিয়ে ঘুরে পশ্চিমে হেলে পড়েছে।

চালের বস্তা আগলে দুলাল মেম্বার দাঁড়িয়ে আছে। এনতাজ আলিদের দেখে চরম বিরক্তি নিয়ে বলল, কি রে! কী চায় তোদের?
এনতাজ আলি বলে, চাল।
দুলাল মেম্বার খ্যাঁকখ্যাঁক করে ওঠে, ;তোদের জন্যে তো কোনো সাহায্য আসেনি। মাঠের ধান ডুবে গেছে। চাল দেওয়া হচ্ছে। গুয়ের টাঙ্কি শুকিয়ে গেলে আসিস, গু ঢেলে দেব।
লজ্জায় অপমানে কাঁপতে কাঁপতে বউ ছেলের হাত ধরে বাড়ি ফিরে আসে এনতাজ আলি।
পরদিন সকালে জাকির নোয়াগাও থেকে মাউতি আটিতে ফিরছিল। চরনারচরে ঢোকার মুখে দেখে স্কুল বিল্ডিং লাগোয়া ডালপালা ছড়ানো ছোট যে মেড্ডা গাছ তার ডাল ধরে মনির ঝুলছে।

ঘটনা ঘটেছে কিছুক্ষণ আগে। স্কুলে ক্লাস শুরু হয়ে গেলে মনির এসে দাঁড়ায় মেড্ডা গাছের নিচে। বুকে যথেষ্ট বল নিয়ে আসে। মনে মনে বলে, মুই ডরালু নায়। মুই পারতাম। বলে ডানে-বামে তাকিয়ে যখন দেখে আশেপাশে কেউ নেই তখন আঁচড়েপাচড়ে উঠে পড়ে গাছে। উঠেই হাত ফসকে পড়তে পড়তে একটা ডাল ধরে ঝুলে থাকে।

মনিরের এই দুরবস্থা থেকে জাকির গাছের নিচে গিয়ে কাঁধ পেতে দেয়। বলে, নে আমার কাঁধে পা দিয়ে নেমে আয়। কী জানি কী হয় মনিরের, রাজি হয় না। হাত ছেড়ে দিয়ে লাফ দেয়। আর লাফ দিয়েই বলে কঁকিয়ে উঠে পা চেপে ধরে বসে পড়ে মাটিতে। ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে জাকিরের কাঁধে ভর দিয়ে বাড়ি ফেরে।

বর্ষা শেষে শীত আসে। শীতের সময় হাওরের পানি নেমে যায়। সেখানে ধান চাষ হয়। বিপুল জলরাশির স্থান দখল করে বিস্তীর্ণ সবুজ ধানক্ষেত। প্রাকৃতিক নিয়মে হাওরের চেহারা বদলে যায়। বদলায় না কেবল এনতাজ আলির জীবন।

জানুয়ারির শুরুতে নূরজাহান মনিরকে সঙ্গে নিয়ে যায় চরনারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে। স্কুলের বারান্দায় ওঠে না নূরজাহান। ছেলেকে নিয়ে নিচে দাঁড়িয়ে থাকে। হেড স্যার পায়জামার ফিতা খুলতে খুলতে ব্যস্তসমস্ত হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে বারান্দা ধরে ছুটছিলেন। নূরজাহান তখনই হেড স্যারকে ডেকে বসে। একপলক তাকিয়ে দুই হাতে পায়জামার ফিতা ধরে হেড স্যার বারান্দা পেরিয়ে চলে যান। কিছুক্ষণ পর ফিরে এলে নূরজাহান হেড স্যারের কাছে মনিরকে স্কুলে ভর্তি করানোর কথা পাড়ে।

হেড স্যার বয়স্ক মানুষ। রিটায়ারমেন্টে যাবেন কিছুদিনের ভেতর। সুইপারের ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করা যাবে কিনা এর কোনো সুরাহা তিনি করতে পারেন না। বলেন, ছেলেকে কোন ক্লাসে ভর্তি করবি। বড় হয়ে গেছে ছেলে। যা যা বাড়ি নিয়ে যা।
নূরজাহান নাছোড়বান্দা। বলে, ছার! ছোট কিলাশো ভর্তি করি লইতা। অসুবিধা ওইত নায়।
হেড স্যার বলেন, অসুবিধা আছে। ভর্তি করা যাবে না।

স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সহ সভাপতি সুলেখা রাণী দাস স্কুলে এসেছিলেন নাতনিকে পৌঁছে দিতে। পাশে দাঁড়িয়ে ওদের কথোপকথন শুনছিলেন। তিনি হেড স্যারের মনোভাব বুঝতে পেরে বললেন, বয়স যায় হোক, ভর্তি করে নেন স্যার। ক্লাসের একেবারে পেছনের বেঞ্চে বসবে।

দুলাল মেম্বার একটু দূরে দাঁড়িয়ে ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের কন্সট্রাকশনের কাজ দেখছিল। সুলেখা রাণী দাসের কথা কানে যেতেই এগিয়ে এসে গজগজ করে বলল, সুইপারের ছেলে পড়বে তো গু মুত পরিষ্কার করবে কে?
নূরজাহান এর পর আর কথা বাড়ায় না। ছেলেকে নিয়ে বাড়ি চলে আসে।

হেড স্যার থাকেন দিরাই সদরে। তাড়াতাড়ি হাতের কাজ গুছিয়ে নিয়ে বেলা গড়াবার আগেই তিনি বাড়ির পথ ধরেন। আগামিকাল শুক্রবার। স্কুল বন্ধ।

শনিবারে স্কুলে আসতে দেরি হয় হেড স্যারের। মেজ মেয়ের জামাই এসেছিল গতকাল। তাকে সিলেটের বাসে তুলে দিয়ে তবে তিনি রওনা হয়েছেন। স্কুলে এসে দেখেন ছেলেমেয়েরা জটলা পাকিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। ক্লাসরুমগুলো বন্ধ। স্কুলে আসতে প্রায়ই দেরি হয় বলে তিনি ক্লাসরুমের চাবি স্কুলের শিক্ষিকা বিউটি দাসের কাছে রেখে যান। সে-ই সকালে স্কুল খোলার ব্যবস্থা করে। বিউটি দাসের বাবা দেবরাজ দাস স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি। কোথাও কোনো অসুবিধা নেই। হেড স্যার ভাবেন, আজ কী হলো? বারান্দায় ছেলেমেয়েদের ভিড়ের ভেতর তিনি বিউটি দাসকে দেখেন। দেবরাজ দাসকেও দেখেন। স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সদস্য মাধুরী দাস, নিশিকান্ত বৈদ্য, সত্যবান বৈষ্ণবকে দেখেন।

হেড স্যার স্কুল বারান্দায় উঠে এসে জানলেন ক্লাসরুমের প্রত্যেকটা তালার ভেতর কাঁচা গু। কে যেন শলার কাঠির মাথায় গু লাগিয়ে তালার ভেতর ঠেসে ঢুকিয়ে রেখে গেছে।

ছেলেমেয়েরা হৈচৈ করছে। অন্যান্যরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে কেমন করে ঘটল এমন ঘটনা। কে ঘটাতে পারে। কেউ কোনো কূল কিনারা খুঁজে পায় না। হেড স্যার অসহায় বোধ করেন। আগে ক্লাসরুম খোলা দরকার। তিনি সাহায্যের আশায় চারপাশে তাকান। দেখেন স্কুল মাঠের ওপাশে মনির মাটির ঢেলা নিয়ে একা একা খেলছে। তিনি ওকেই ডাকেন।

মনিরকে দিয়ে হেড স্যার ক্লাসরুমের তালাগুলো খুলিয়ে পরিষ্কার করিয়ে নেন। কাজ শেষ হলে তিনি খুশি হয়ে মনিরকে বিশ টাকা বকশিস দেন। মনিরের জীবনের প্রথম উপার্জন। টাকা হাতে তিরের মতো বাড়ির দিকে ছুটে যায় মনির।

এনতাজ আলি এই সকাল বেলা জাকিরকে তারস্বরে শাপশাপান্ত করছিল। এতখানি বয়স হয়েছে, আয় রোজগারের কোনো চিন্তা নেই। সারাদিন বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে টো টো করে ঘুরে বেড়ানো। ঘরে যদি টাকা আনতে না পারে তাহলে এই বাড়িতে জাকিরের ভাত আগামিকাল থেকে বন্ধ হয়ে যাবে এমন হুশিয়ারিও ছেলের বিরুদ্ধে উচ্চারণ করে এনতাজ আলি।

হাতে একটা টাকাও নেই আজ। ঘরে চাল নেই। ডাল তরকারি তো তারা কোনোদিন চায়নি। মাথা খারাপের মতো অবস্থা এনতাজ আলির। তখনই লাফাতে লাফাতে বাড়িতে ঢোকে মনির। দশ টাকার লাল নোট দুটো মায়ের হাতে দিয়ে ঘটনা খুলে বলে।

এনতাজ আলি শোনে রাস্তার ওপর থেকে কেউ তার নাম ধরে ডাকছে। বেরিয়ে এসে দেখে মরতুজ আলি মিয়ার বাড়ির কিষান কুদ্দুস। মিয়া বাড়িতে কাজের কথা শুনে এনতাজ আলি ফিরে আসে বাড়ির ভেতর। নূরজাহানের কাছ থেকে মনিরের আনা বিশ টাকা থেকে দশ টাকা চেয়ে নেয়। ঘরের ভেতর থেকে কেরোসিনের খালি বোতলটা নেয়। ওই টাকায় কেরোসিন কিনে মরতুজ আলি মিয়ার বাড়ির দিকে রওনা হয়।

মরতুজ আলি মিয়ার বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ায় এনতাজ আলি। উঠোনে আড়াআড়ি বাঁধা তারে কাপড় শুকাচ্ছে। এনতাজ আলি যতটা সম্ভব নিজেকে গুটিয়ে, কাপড়ে নিজের ছোঁয়া বাঁচিয়ে চারা কাঁঠাল গাছের নিচে এসে দাঁড়ায়। ঘর থেকে মরতুজ আলি মিয়ার বুড়ি মা শারমান বিবি তারপরেও চেঁচাতে চেঁচাতে উঠোনে নেমে আসে, ছ্যা ছ্যা ছ্যা ছ্যা দিলি তো, দিলি তো সব কাচা কাপড়গুলো ছুঁয়ে। ও বউ বউ এদিকে আসো দেখি। আমার নামাজের কাপড়টা টান দেও। সব ছুঁয়ে দিল।

শাশুড়ির চিৎকার শুনে মরতুজ আলি মিয়ার ছেলের বউ জায়েদা বেগম রান্নাঘর থেকে ছুটে আসে। হাতে তরকারির ঝোল আর চুলার কালি লেগে আছে। পানি দিয়ে যে চট করে ধুয়ে নেবে সেই সময়টুকুও শাশুড়ি দেয় না। খনখনে গলায় আটি মাথায় তুলে তারস্বরে চেঁচাতে থাকে, কই গো বউ! কাপড়ে টান দেও।

হাতের কব্জি আর মুখের সাহায্য নিয়ে জায়েদা বেগম শাশুড়ির শাড়িটা আগে সরিয়ে নেয়। শারমান বিবির চিৎকার থামে না। বলেই চলে, কুকুরে ছুঁয়ে দেবে বলে মাটি থেকে আসমানে তুলে কাপড় শুকাতে দিই। মেথরে যদি এখন ছোঁয়, ও মরতুজ! কাপড় শুকাবি কোথায়? চারপাশে তাকিয়ে বুড়ি কোথাও ছেলেকে দেখতে না পেয়ে গজগজ করতে করতে ঘরে ঢুকে যায়।

উঠোনে চারা কাঁঠাল গাছের নিচে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে এনতাজ আলি। ভাবে, ইতর জীবন ওদের। নিকৃষ্ট, হীন। অন্যের উচ্ছিষ্ট খেয়ে বাঁচে। সুইপার মেথরের এই জীবন বড় কষ্টের, অবহেলা অপমান আর অবজ্ঞার। মর্যাদাহীন এই জীবন ওর বাবা কাটিয়েছে, দাদা কাটিয়েছে। কতপুরুষ তাদের এই যন্ত্রণাময় জীবন কাটাতে হবে জানেনা এনতাজ আলি। শুধু জানে, এই জীবন থেকে মুক্তি নেই ওদের।

আগে তাও কিছু হোক না হোক কাজ ছিল। দুটো পয়সা রোজগার করে বউ বাচ্চা নিয়ে কিছু খেয়ে বাঁচা যেত। চারদিকে অভাব এখন। রোজগার একেবারে নেই বললেই চলে। একদিন চললে পরের দিন কিভাবে চলবে সেই চিন্তায় এক এক সময় মনে হয় হাওরে ডুবে, নাহয় হিজল গাছে গলায় ফাঁস নিয়ে মরে।

মরতুজ আলি মিয়া বাড়িতে ঢুকে এনতাজ আলিকে উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঘেউ ঘেউ করে ওঠে, ওই রকম ইলেক্ট্রিকের পোলের মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন, ঢোক পায়খানায়। দেখ গু মুতের ওপর কেমন করে ভেসে বেড়াচ্ছে। এনতাজ আলি ল্যাট্রিনের দিকে এগিয়ে যায়। মরতুজ আলি মিয়া দূরে সরে গিয়ে ঘরের বারান্দার সামনে দাঁড়ায়। চোখ মুখ কুঁচকে ভীষণ বিরক্তি নিয়ে বলে, কী কাজ করিস! দুই দিন পরপরই ও ছাতা বন্ধ হয়ে গু মুতে পায়খানা ভেসে যায়।

মরতুজ আলি মিয়া এই চরনারচরের অবস্থাসম্পন্ন মানুষ। বেশিরভাগ পরিবার যখন খুব ভোরে নাহয় সন্ধ্যার পর গাছের আড়ালে খোলা জায়গায় প্রাকৃতিক কাজ সারে, তখন থেকেই মরতুজ আলি মিয়ার পরিবারের সদস্যরা পায়খানা ব্যবহার করে আসছে। এনতাজ আলির মনে আছে মরতুজ আলি মিয়া যেদিন বাড়িতে কাঁচা পায়খানা ভেঙ্গে স্যানিটারি ল্যাট্রিন বসায় তখন বাপজান বেঁচে। চারিদিকে যখন কাজের হাহাকার পড়ে গিয়েছিল তখন শ্যামারচর থেকে রোজগারের আশায় বাপজান চলে এসেছিল চরনারচর। এনতাজ আলি তখন ছোট। বাপে-পুতে এসে দাঁড়িয়েছিল এই উঠোনে। বাপ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে বলেছিল, আপনার বাড়ির রোজগারও বন্ধ হয়ে গেল বড়মিয়া!

মরতুজ আলি মিয়া ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে বলেছিল, তাহলে তো ভালোই হতো! এরপর দেখবা দুইদিন পরপর পায়খানার পাইপ বন্ধ হবে, টাঙ্কি ভর্তি হয়ে যাবে। হাগা মুতার যেমন বিরাম নেই, তোদের হাত থেকেও নিস্তার নেই। এনতাজ আলি ভাবে, বাপজান অকালে মরে শান্তি পেয়েছে। মরেছে মদ খেয়ে। বেঁচে থাকলে মরত না খেয়ে। মনির দৌড়ে এসে ঢোকে মরতুজ আলি মিয়ার বাড়ির উঠোনে। বাবার গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। বাবার মুখটা খুব শুকনো দেখাচ্ছে। কোনো কথা বলার সাহস হয় না মনিরের। বাবার ডানহাতের কয়েকটা আঙ্গুল নিজের হাতের ভেতর নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকে।

মনিরের সমবয়সী মরতুজ আলি মিয়ার ছোট নাতি তালিম হাতে একটা খেলনা পিস্তল নিয়ে ছুটে আসে মনিরের দিকে। উঠোনের ওপাশ থেকে চিলের মতো ছুটে এসে জায়েদা বেগম ছোঁ মেরে কোলে তুলে নিয়ে সুইপারের ছোঁয়া থেকে নিজের ছেলেকে রক্ষা করে। তালিম মায়ের কোলে উঠে মনিরের দিকে পিস্তল তাক করে ট্রিগার টিপে দেয়। মুখে বলে, ঠাস।

এনতাজ আলি ল্যাট্রিনে ঢুকে দেখে প্যান উপচে মলে ভেসে যাচ্ছে পায়খানা। বোতল থেকে কেরোসিন ঢেলে কাঁধ পর্যন্ত দুই হাতে মাখে, দুই পায়ে মাখে ঊরু পর্যন্ত। এনতাজ আলি চোখ বন্ধ করে, নাকমুখ ঠেসে ধরে কুঁচকে মাথাটাকে উলটোদিকে যতটা সম্ভব ঘুরিয়ে দম বন্ধ করে হাত ঢুকিয়ে দেয় ময়লা পানিতে ভেসে যাওয়া প্যানের ভেতর। হাতড়ে চলে যতক্ষণ না হাতে শক্তমতো কিছু বাধে।

তারপর ময়লার ভেতর থেকে একটা খেলনা জিপ গাড়ি টেনে বের করে আনে। চলাচলের পথ খোলা পেয়ে হড়হড় করে ল্যাট্রিনের পানি ভাসমান মলসহ নেমে যায় নিমেষে। তোলা পানি দিয়ে ভালো করে ল্যাট্রিন ধুয়ে পরিষ্কার করে শান্তভাবে এনতাজ আলি এসে দাঁড়ায় উঠোনে। মনির তখনো দাঁড়িয়ে চারা কাঁঠাল গাছের নিচে। জুলজুল করে তাকায় বাবার দিকে। এনতাজ আলির হাতে খেলনা জিপ গাড়ি। তালিম ছুটে আসে। হাত বাড়ায় এনতাজ আলির দিকে, আমার গাড়ি। দাও।

জায়েদা বেগম এসে ছেলের গালে ঠাস করে একটা চড় মারে। তালিম হাতপা ছুঁড়ে কাঁদতে আরম্ভ করে। জায়েদা বেগম ছেলেকে কোলে তুলে ছুঁড়ে দেয় ঘরের দাওয়ায়। শারমান বিবি বসেছিল সেখানে। নাতিকে ধরে ঠাস ঠাস করে আরও দুইটা চড় মারে পিঠে। দাঁতে দাঁত পিষে বলে, যাবি আর ওই ছোটলোকের হাতের জিনিস নিতে?

মরতুজ আলি মিয়ার কাছ থেকে পারিশ্রমিক নিয়ে ছেলের হাত ধরে বেরিয়ে আসে এনতাজ আলি। ছেলেকে কাঁধে তুলে নিয়ে মনোহরের দোকানের দিকে যায়। দোকান থেকে এনতাজ আলি চাল কেনে, রান্নার তেল কেনে। রশুন নেয়, কয়েকটা তেজপাতাও নেয় আজ। মনে মনে ভাবে, সবজি কিনবে ফেরার পথে। তরকারি দিয়ে সবাই মিলে ভাত খাবে ভাবতেই চোখ উপচে পানি চলে আসে। চোখজোড়া একবার বন্ধ করে, একবার টানটান করে সেই পানি আটকায় এনতাজ আলি।

আবার এক শনিবার সকালে চরনারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হেড স্যার স্কুলে এসে দেখেন কে বা কারা ক্লাসরুমের তালার ভেতর গু ঢুকিয়ে রেখে গেছে। এই ঘটনায় হেড স্যার বিশেষ বিব্রত বোধ করেন এবং চারপাশে তাকান। স্কুল মাঠের কোথাও মনিরকে দেখতে না পেয়ে তিনি একজন ছাত্রকে পাঠান মাউতি আটিতে মনিরকে ডেকে আনার জন্য।

মনির এসে তালার ভেতরের ময়লা পরিষ্কার করে দিতে রাজি হয়। তবে অদ্ভুত এক শর্ত জুড়ে দেয়। মনির জানায় এই তালা পরিষ্কার করার জন্য তাকে কোনো টাকা-পয়সা দিতে হবে না। তাকে স্কুলে ভর্তি করে নিতে হবে। উপস্থিত শিক্ষক, অভিভাবক, ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের মধ্যে ব্যাপারটা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও কোনো সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। তারা এই ময়লা পরিষ্কার করার জন্য মনিরকে বেশি টাকার লোভ দেখায়। স্কুল কমিটির সদস্য সত্যবান বৈষ্ণব তাকে এই কাজের জন্য পঞ্চাশ টাকা দিতে চায়। মনির রাজি হয় না। তাকে স্কুলে ভর্তির গোঁ ধরে থাকে। শেষে হেড স্যার দেখি কী করা যায় ধরনের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে মনিরকে দিয়ে কাজটা করিয়ে নেন।

মনির এরপর প্রতিদিন স্কুলে এসে হেড স্যারের কাছে ধর্না দেয়। হেড স্যার প্রতিদিন যে স্কুলে আসেন তা নয়, তবে মনির আসে প্রতিদিন স্কুলে হেড স্যারের প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে দিতে। হেড স্যার নানান টালবাহানা করেন কিন্তু মনিরকে কোনোভাবেই স্কুলে ভর্তির উদ্যোগ গ্রহণ করেন না। তারপর একদিন নিজ প্রতিশ্রুতির কথা বেমালুম ভুলে যান হেড স্যার এবং তাকে বিরক্ত করার জন্য মনিরকে বিশেষ ভর্ৎসনা করেন।

এরপরের কাহিনি একরৈখিক। দ্রুত ঘটতে থাকে। চরনারচরের সমসাময়িক অন্যসব ঘটনাকে ছাপিয়ে এই ঘটনা অধিক গুরুত্ব লাভ করে। এবার আর ক্লাসরুমের তালার ভেতরে না, ক্লাসরুমের ভেতরে বেঞ্চের উপর দেখা যায় কে বা কারা গু ঢেলে রেখে গেছে। সেই ময়লা মনিরকে দিয়ে পরিষ্কার করানো যায় না। এনতাজ আলিকে ডাকতে হয়। এই কাজ করাতে বিশ টাকা বা পঞ্চাশ টাকায় কুলায় না। এনতাজ আলিকে ১০০ টাকার দুটো নোট দিতে হয়।

মাঝে দিন কয়েক বিরতি দিয়ে আবার দেখা যায় ক্লাসরুমের বেঞ্চের উপর গু। আবার ডাক পড়ে এনতাজ আলির। স্কুলের তিনটা ক্লাসরুমই ময়লায় অপরিষ্কার হয়ে আছে। এবার সেই ময়লা পরিষ্কার করতে এনতাজ আলিকে স্কুলের ফান্ড থেকে পাঁচশ টাকা দিয়ে দিতে হয়। স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা বিষয়টা নিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করেন। একেকজন একেক মত দেন। কেউ বলেন, এ কাজ নিশ্চিত মনিরের। সে স্কুলে ভর্তি হতে না পেরে এই রকম করছে।

আরেকজন বলেন, অতো ছোট ছেলে এই কাজ করার সাহস পাবে না। দ্যাখো এনতাজ আলি নিজেই এই কাজ করে কি না। আয় রোজগার নেই, স্কুলের এই গু সাফ করে তো বেশ কামাচ্ছে। স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সদস্য রিতেশ রায় বলে, সবই নিজেদের অনুমান। হাতে তো কোনো প্রমান নেই। প্রমান ছাড়া শুধু অনুমানের ভিত্তিতে কাউকে দোষারোপ করা যায় কিভাবে?

সবাই রিতেশের কথায় যুক্তি খুঁজে পান। শিক্ষকরা স্কুলের ছেলেমেয়েদের বলেন কারা এই কাজ করছে খোঁজখবর করতে। প্রতিদিন স্কুল বন্ধের সময় ক্লাসরুমের জানালাগুলো শক্ত করে বন্ধ করার ব্যবস্থা করেন। এতকিছু করার পরেও কাউকে এই কাজের জন্য দায়ী করে সনাক্ত করা যায় না। কয়েকদিন পর আবার স্কুলের বারান্দায়, ক্লাসরুমগুলোর ভেতরে ছড়ানো ছিটানো গু দেখা যায়।

এবার অত্যাচার সত্যি বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে যায়। সবাই খুব বিরক্ত হন। স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মিটিং ডাকেন। অপকর্মের হোতাকে ধরতে স্কুলে পাহারা বসানোর সিদ্ধান্ত হয়। পালা করে পাহারা বসে। রাত জেগে পাহারা দেওয়া হয়। কাউকে ধরা যায় না। ক্লাসরুমের ভেতর সবার অলক্ষ্যে কেউ আবারও গু ঢেলে রেখে যায়।

তবে ঘটনা যে ঘটায় সে একদিন ধরা পড়ে। সেদিন পাহারায় ছিল স্কুল কমিটির দুইজন সদস্য সত্যবান বৈষ্ণব আর রিতেশ রায়। দুইজন সারারাত স্কুল প্রাঙ্গণে হাঁটাহাটি করে। নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করে। দীর্ঘদিন পরে যেন এমন একটা টানা অবসরে নিজেদের ছেলেবেলার স্মৃতি রোমন্থন করার সুযোগ পায়। অপ্রত্যাশিত একটা রাত যেন সত্যবান আর রিতেশকে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি কিছু দিয়ে দেয়।

রাতের শেষ প্রহরের দিকে দুইজনেরই ঘুমে চোখ টেনে আসছিল। স্কুলের বারান্দার পিলারের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে রিতেশ ঘুমিয়ে পড়েছিল বোধহয়। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এসেছিল। সত্যবানও ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে দুই হাঁটুর ভেতর মাথা গুঁজে দিয়েছিল। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল। ভোরের আলো তখনো পরিষ্কার করে ফোটেনি। সেই স্বল্প আলোতে সত্যবান স্পষ্ট দেখতে পায় পঞ্চম শ্রেণির ক্লাসরুমের বাইরের দিকে যে মেড্ডাগাছ, সেই গাছে মনির। হাতে পলিথিন ব্যাগ। ঘুলঘুলি দিয়ে মনির পলিথিন ব্যাগটা ক্লাসরুমের ভেতর ছুঁড়ে দিল।

সত্যবান ধাক্কা দেয় রিতেশকে। মাথা ঝাঁকিয়ে ঘুমের ভাব তাড়িয়ে রিতেশ চোখ মেলে তাকায়। ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় চোখ পিটপিট করে বিস্তৃত সুনসান ফাঁকা স্কুল মাঠের চারপাশে দৃষ্টি বুলিয়ে আনে। দেখে মেড্ডা গাছ থেকে মনির নামছে। গাছের গোড়ায় রাখা পলিথিন ব্যাগ নিয়ে মনির স্কুল বারান্দায় উঠে আসে। সত্যবান আর রিতেশ গিয়ে পিছন দিক থেকে মনিরকে খামচে ধরে সবলে।

কেন জানি সত্যবান কিংবা রিতেশ কেউ কোনো কথা বলে না। মনিরকে ধরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। নিজের কাছেই তাদের অবিশ্বাস্য লাগে। যাকে ধরার জন্য এত আয়োজন তাকে হাতেনাতে ধরেও ওরা দুইজনই কেমন যেন অবসন্ন বোধ করে। হৈচৈ করে না কোনো। নিতান্তই যেন দায়িত্ব পালন করে। মনিরকে স্কুল মাঠে জাতীয় পতাকা তোলার বাঁশের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধে। লিকলিকে হাত-পায়ের ছোট্ট শরীরটা তখন থরথর করে কেঁপে উঠেছিল কিনা সত্যবান বা রিতেশ কেউ বুঝতে পারে না।

ভীষণ কান্না পায় মনিরের। তবু কাঁদে না। ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকায়। দড়ির বাঁধনে হাত জ্বলে যায় তবু একবারও আহ্‌ উহ্‌ করে না। স্থির হয়ে পিঠমোড়া অবস্থায় বসে থাকে। সত্যবান আর রিতেশ কোনো কথা না বলে চলে যায় স্নান করতে। যাওয়ার আগে শুধু বলে যায় স্নান সেরে সবাইকে ডেকে এনে এর বিচার করা হবে। ওরা বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্কুল বিল্ডিংয়ের পিছন থেকে ছুটে আসে জাকির। মনিরের কাঁধ স্পর্শ করে অস্ফূটে প্রায় ফিসফিসানির মতো ডাকে, মনির

জাকিরের ডাক শুনে অমনি কান্নায় বুক বন্ধ হয়ে আসে মনিরের। জাকির সময় নষ্ট করে না। দ্রুত বাঁধন খুলে দেয়। মনির ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে ভাইকে। হাত খোলা পেয়ে প্রথমে নিজের চোখের পানি মোছে। মনির যেখানে বসে ছিল কোনো কথা না বলে সেখানে বসে পড়ে জাকির। তাড়া দেয় মনিরকে,নে তাড়াতাড়ি দড়ি দিয়ে বাঁশের সঙ্গে আমার হাতদুটো বেঁধে ফেল। ঠিক যেরকম করে ওরা তোকে বেঁধেছিল সেইরকম করে বাঁধবি।

ভীষণ অবাক হয় মনির জাকিরের এমন কথায়। বলে, ওরা এক্ষুনি চলে আসবে। চল্‌ পালাই। জাকির বলে,পালালে ওরা তোকে খুঁজে বের করবেই। আজ খুঁজে না পেলেও, কাল নাহয় পরশু ঠিকই খুঁজে পাবে তোকে। তখন খুব শাস্তি দেবে। আবার তাড়া দেয় জাকির,এখন বাঁশের সঙ্গে তাড়াতাড়ি বেঁধে ফেল আমাকে।

মনিরের মাথার ভেতর কিছু ঢোকে না। কিছু চিন্তা করতেও পারে না। আর কোনো ভাবনাচিন্তায় না গিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা দড়ি তুলে নিয়ে বাঁশের খুঁটির সঙ্গে পিঠমোড়া করে বেঁধে ফেলে জাকিরের হাতদুটো।

জাকির বলে, যা পালিয়ে যা এখন। কেউ যেন তোকে না দেখে।
মনির ভায়ের মাথায় হাত দিয়ে বলে, তোকে ওরা খুব মারবে।
অস্থির হয়ে ওঠে জাকির। মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলে, যা পালা মনির। ওরা চলে আসবে এখুনি। পালিয়ে যা।
মনির রাজি হয় না। ভায়ের কাঁধ আঁকড়ে ধরে মাটিতে বসে পড়ে। কান্না মেশানো গলায় বলে, ওরা তোকে খুব মারবে। খুউব। তুই ব্যথা পাবি। কষ্ট হবে তোর। বলেই ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে মনির।
স্কুল বিল্ডিংয়ের ওপাশে বেশ কয়েকজন মানুষের সম্মিলিত উত্তেজিত কণ্ঠস্বর শোনা যায়। সেই শোর এগিয়ে আসছে এদিক পানেই। স্কুল বিল্ডিংয়ের কোনা ঘুরে দেখা যায় দুলাল মেম্বারকে।
জাকির কাতরভাবে জোর দিয়ে চাপাস্বরে বলে, মনির পালা। পালিয়ে যা।
মনির দৌড় শুরু করে। স্কুল মাঠ পেরিয়ে কার্তিকপুরের রাস্তা ছাড়িয়ে দৌড়াতে থাকে ধানক্ষেতের শুকনো খড়খড়ে আইলের উপর দিয়ে। কাইল্যাগুটা হাওরে শাইল ধান পাকতে শুরু করেছে। পাকা ধানের পুরুষ্টু ছড়া বাতাসে আছড়ে পড়ে মনিরের পায়ে। মনির থামে না। দৌড়ায় ঊর্ধ্বশ্বাসে।

সত্যবান আর রিতেশ ফিরে আসে স্নান সেরে। সঙ্গে আসে দুলাল মেম্বার। মেম্বারের হাতে কাঁচা বাঁশের ছিপছিপে কঞ্চি। সত্যবান পতাকা স্ট্যান্ডের দিকে সন্দেহের চোখে তাকায়। স্পষ্ট মনে আছে ওরা মনিরকে ধরেছিল হাতেনাতে। তাকেই বেঁধে রেখে গিয়েছিল এখানে। পতাকা স্ট্যান্ডের সঙ্গে তেমনি দড়িতে বাঁধা জাকির, মনির নয়। রিতেশ এসবের কিছুই খেয়াল করে না। দুলাল মেম্বার ছুটে এসে বাতাসে তীব্র শিসের মতো শব্দ তুলে হাতের কঞ্চি দিয়ে সপাত করে আঘাত করে জাকিরকে।

বিলের মাঝখানে বাতাসের ঘূর্ণি ওঠে। আচমকা ওঠা সেই ঘূর্ণি মনিরকে ঠেলে নিয়ে ফেলে করচ বনে। মাঠ পেরিয়ে করচ বনে হোঁচট খেয়ে উলটে পড়ে মনির। করচের রুক্ষ শিকড়ে আটকে যায় পা। পায়ের আঙুল ফেটে রক্ত বেরোয়। কালবৈশাখীর তীক্ষ্ন শো শো আওয়াজের মতো জাকিরের; বলে আর্তচিৎকার এসে লাগে মনিরের কানে।

ঝোপাল গাঢ় কালো সারি সারি করচ গাছের ভেতর নিকষ অন্ধকারে ডুবে যেতে থাকে মনির। আবার ছুটে আসে বাতাস কেটে জাকিরের কাতর কণ্ঠ। জাকির আঘাত সহ্য করতে তীক্ষ্নভাবে গোঙানির মতো আর্তনাদ করে ওঠে।

থেমে যায় মনির। সটান দাঁড়িয়ে পড়ে। পিছন ফিরে ঘুরে যায়। উলটো পথে ছুটতে থাকে। ছুটতে ছুটতে ফিরে আসে স্কুল মাঠে। জাকির দুই হাঁটু ভাঁজ করে শরীর কুঁকড়ে কাত হয়ে পড়ে আছে মাটিতে। ঘাম ঝরছে দরদর করে। ধুলায় মাখামাখি পুরো শরীর। ধুলোমাখা সেই গায়ে রক্তের টানা টানা লম্বা দাগ। ডানহাতে কঞ্চি উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুলাল মেম্বার। হাতে ধরা কাঁচা বাঁশের ছিপছিপে কঞ্চিতে মেম্বার বাতাস কেটে শাত শাত শব্দ তোলে। বামহাতের মুঠোতে নিজের লুঙ্গি কোঁচা করে ধরা।

ছুটে আসে মনির। জাকিরকে আড়াল করে দাঁড়ায় দুলাল মেম্বারের মুখোমুখি। রাগে ক্ষ্যাপা নেকড়ের মতো গলার ভেতর গরগর শব্দ তুলে ভয়শূন্য কণ্ঠে বলে, পড়তে দিতে পার না, খাবার দিতে পার না, পার শুধু মারতে।

ভোরবেলা শোরগোল শুনে গ্রামবাসি জড়ো হয় স্কুল মাঠে। খবর পেয়ে ছুটে আসে এনতাজ আলি। মানুষের ভিড় ঠেলে ছুটে যায় অসহায়ভাবে পড়ে থাকা ছেলের কাছে। ছুটে আসে নূরজাহান। মাটিতে আছড়ে পড়ে জাপটে ধরে ছেলেকে।

হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে মনির। দুই হাত দিয়ে পরম আদরে বুকের ভেতর জড়িয়ে ধরে ভাইকে। মাথা তুলে সরাসরি তাকায় দুলাল মেম্বারের দিকে। অসমসাহসিক দুই চোখ ফেটে যেন রক্ত বেরিয়ে আসবে। সেই দুই চোখের ভাষা স্পষ্ট, মুই ডরালু নায়। জাকিরের বেদনার্ত আকুতি ছাপিয়ে মনিরের তীব্র আত্মপ্রত্যয়ী কণ্ঠ অনুরণিত হতে থাকে হাওরের বাতাসে, মারো আমাদের! মারো দেখি আর একবার।

আবার কোনো আঘাত এলে ওরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, নাকি অনেকদিনের বঞ্চনার পুঞ্জীভূত জমাট ক্রোধ নিয়ে নতুন করে ঝাঁপিয়ে পড়বে মানুষের মর্যাদা আদায়ে তা মনির জানে না। যেমন জানে না জাকির, এনতাজ আলি, নূরজাহান কিংবা চরনারচরের মাউতি আটির সুইপাররা। এমনকি সেই ভবিতব্যর কথা বলতে পারে না এখনকার শক্তিধর দুলাল মেম্বার নিজেও।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com