আজ শুক্রবার, ৭ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং, ১লা মুহাররম, ১৪৩৯ হিজরী, শরৎকাল, সময়ঃ বিকাল ৫:৪০ মিনিট | Bangla Font Converter | লাইভ ক্রিকেট

বাংলাদেশের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা

প্রতিবছর ডিসেম্বর এলেই আমরা পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করি। এ আলোচনার সিংহভাগজুড়েই থাকে ১৯৭১ সালের গোড়ার দিকে হঠকারীভাবে শুরু হওয়া সামরিক অভিযানের বিষয়টি। নিঃসন্দেহে সেই অভিযান ছিল তখনকার ক্ষমতাকাঠামোর খুবই মারাত্মক একটি ভুল।

কিন্তু আজকের বাংলাদেশ সেই গুরুত্বপূর্ণ নয় মাস সময়ের মধ্যে সৃষ্টি হয়নি। এটা আসলে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকশ্রেণি ও সামরিক বাহিনীর ক্রমপুঞ্জীভূত অন্যায়ের ফলাফল হিসেবে ঘটেছিল, যারা পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলকে উপনিবেশের মতো ব্যবহার করতে চেয়েছিল। ফলে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য এটা স্বাধীনতার আন্দোলন ছিল, যেখানে ভারত সরকার সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। কারণ, আমরাই তাদের দ্বিজাতি তত্ত্বের নশ্বরতা প্রমাণিত করার সুযোগ দিয়েছিলাম।

 

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরপরই ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তৎকালীন পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান মনে করলেন, পাকিস্তানের একমাত্র মাতৃভাষা হিসেবে উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়া সমীচীন। এরপর ২১ মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এ বিতর্কে ঢুকে গেলেন, সেদিন তিনি বললেন, ‘আমাকে এটা বলতে দিন যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র মাতৃভাষা, অন্য কোনো ভাষা পাকিস্তানের মাতৃভাষা হবে না।’

বাঙালিদের কাছে এটা গ্রহণযোগ্য ছিল না। কারণ, এতে করে তারা পাঞ্জাবি ও মুহাজিরদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে, উর্দু ভাষার ওপর যাদের দখল ছিল স্বাভাবিকভাবেই বেশি। ফলে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চলতেই থাকে, কিন্তু ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রাদেশিক সরকার প্রতিবাদরত ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষণ করলে পরিস্থিতি সহিংস রূপ লাভ করে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সেদিন সাত থেকে নয়জন ছাত্র মারা যায় এবং আরও অনেকেই আহত হয়।

 

ওদিকে ছাত্ররা স্মৃতিসৌধ (শহীদ মিনার) বানানোর চেষ্টা করলে পুলিশ সে চেষ্টাও রুখে দেয়, যদিও শেষ পর্যন্ত সরকারকে তা মেনে নিতে হয়। কালক্রমে এই শহীদ মিনার বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের মিলনস্থলে পরিণত হয়, এমনকি স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়ও তা বাঙালিদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। বাঙালিদের একটি ‘শহীদ মিনার’ দেওয়ার পর শেষমেশ ১৯৫৪ সালের সংবিধানের তৃতীয় খসড়ায় এ সিদ্ধান্ত হয় যে উর্দু ও বাংলা পাকিস্তানের মাতৃভাষা হবে। একই সময়ে এ বিধানও করা হয় যে আগামী ২০ বছর ইংরেজি দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হবে (মেহেরুন্নিসা আলী, ১৯৯৬)।

 

কিন্তু এটা করতে গিয়ে বাঙালিদের অনেক চড়া মূল্য দিতে হয়। এর ফলে বাঙালিদের ‘এক ইউনিটের’ মতো একটা ভ্রষ্ট ধারণা মেনে নিতে হয়, আর সে কারণে তাদের সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ত্যাগ করতে হয়। শুধু তা-ই নয়, যখন পুরো পশ্চিম পাকিস্তানকে একটি প্রদেশ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়, তখন পূর্ব বাংলার নাম বদলে পশ্চিম পাকিস্তান রাখা হয়, ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত কাগজে-কলমে তার নাম ছিল পূর্ব বাংলা। পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যকার বৈষম্যের দিকে একপলকে নজর দেওয়া যাক:

১৯৫০-৭০ সালে পাকিস্তানের মোট সরকারি ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৩০ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার, এর মধ্যে সিংহভাগই পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় হয়েছে, যার পরিমাণ ছিল ২১ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ সরকারি ব্যয়ের ৬৯ শতাংশই হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানে। আর পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ৫৫ শতাংশ হলেও সেখানে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৯ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ মোট ব্যয়ের মাত্র ৩০ দশমিক ৪৫ শতাংশ। আবার পাকিস্তানের দুই অংশের আয়ের পরিপ্রেক্ষিতেও এ ব্যয়ের অনুপাত ছিল চরম বৈষম্যমূলক। এ পুরো ২৪ বছর ধরেই বৈদেশিক বাণিজ্যে পূর্ব পাকিস্তানের অনেক উদ্বৃত্ত ছিল।

 

‘কেন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি নিবন্ধে ভিয়েনার একদল গবেষক পাকিস্তান সরকারের দাপ্তরিক কাগজপত্র থেকে তথ্য উদ্ধৃত করে দেখিয়েছেন, পশ্চিম পাকিস্তান কীভাবে পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করেছে। বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁরা দেখিয়েছেন, ‘বৈদেশিক বাণিজ্যের হিসাবে দেখা যায়, পাকিস্তানের সর্বমোট রপ্তানির ৫৯ শতাংশই হতো পূর্ব পাকিস্তান থেকে, কিন্তু আমদানির মাত্র ৩০ শতাংশ সেখানে যেত…একই সময়ে পশ্চিম পাকিস্তান বৈদেশিক মুদ্রা আয় করত ৪১ শতাংশ, আর তারা ব্যয় করত ৭০ শতাংশ।’

 

দেখা গেল পূর্ব পাকিস্তান যে উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টি করত, সেটা পশ্চিম পাকিস্তানের অবকাঠামো ও শিল্প খাতে ব্যয় করা হতো, আবার সে ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে উৎপাদিত পণ্যের নিরাপদ বাজার। ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে ৫ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আসত, আর ওই একই সময়ে পূর্ব পাকিস্তান থেকে সেখানে যেত ৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য।

 

অবিভক্ত পাকিস্তানে যত বৈদেশিক সাহায্য আসত, তার ৮০ ভাগই পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় হতো। ভিয়েন গোষ্ঠীর তথ্যমতে, প্রথম ২০ বছরে উন্নয়ন ব্যয়ের ৭৭ শতাংশই করা হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানে। পূর্ব পাকিস্তানের বড় বড় কাগজ ও পাটকলগুলো শুধু পশ্চিম পাকিস্তানিদেরই ছিল না, সেটি ছিল তাদের একদম খোলা বাজার। এই উপনিবেশ হারানোর কারণেই পাকিস্তানকে ১৯৭২ সালে তার মুদ্রার মান ১৩৫ শতাংশ কমাতে হয়েছিল, আর তার টেক্সটাইল ও ভোগ্যপণ্যের শিল্প মারাত্মকভাবে পড়ে গিয়েছিল।

 

ওদিকে সরকারি চাকরিতে বাঙালি মধ্যবিত্তের প্রতিনিধিত্ব অত্যন্ত কম থাকায় তাদের মধ্যে তিক্ততা সৃষ্টি হয়েছিল। যেমন ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালির সংখ্যা পাকিস্তানের ৫৪ শতাংশ হলেও কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরিতে তাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল মাত্র ১৬ শতাংশ, পররাষ্ট্র ক্যাডারে তাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল ১৫ শতাংশ, সেনাবাহিনীর ১৭ জন জেনারেলের মধ্যে বাঙালি ছিলেন মাত্র একজন।

আর সরকারি বিমান পরিষেবা পিআইএতে বাঙালি কর্মীর সংখ্যা ছিল মাত্র ২৮০, যেখানে পশ্চিম পাকিস্তানের কর্মী ছিল সাত হাজার। জেনারেল (অব.) টিক্কা খান যখন পিপিপির সম্পাদক ছিলেন, তখন আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলেছিলাম। বলেছিলাম, আমার বিবেচনায় তাঁর গণতন্ত্র নিয়ে কথা বলা সাজে না। জার্মানরা কী ভুল করেছিল, উত্তর প্রজন্মকে সেটা জানানোর জন্য তারা জাদুঘর বানিয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানিদের সঙ্গে আমরা যে অন্যায় করেছি, তার জন্য কি আমরা ক্ষমা চাইব, নাকি এই মিথ্যা বিশ্বাস আঁকড়ে ধরেই বাঁচব যে সেটা ভারতীয় ষড়যন্ত্র ছিল?

দ্য নিউজ. কম থেকে নেওয়া
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
বাবর আয়াজ: ফ্রিল্যান্স পাকিস্তানি সাংবাদিক।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com