রক্তে পোষা নীল পাখি||রিপনচন্দ্র মল্লিক

৩৬ বার পঠিত

আম্মু ফোন করে বললো
‘ঋতু, তুই এখন কোথায়?’
‘এই তো আম্মু, বাসায় রওনা দিচ্ছি।’
‘হুম। বাসায় আমি একা। যেখানেই থাকিস, সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসবি।’
‘হ্যাঁ আম্মু, কিছুক্ষণ পরেই ট্রলার ছেড়ে দেবে, এসে পড়ব।’
ফোন রেখে ভাবছিলাম কালিকাপুর ট্রলার ঘাট থেকে মাদারীপুর শহরে ঘন্টা খানেকের মধ্যেই চলে আসতে পারবো। এই ঘাট থেকে আধা ঘণ্টা পরপর ট্রলার ছেড়ে যায়।
আজ ভাগ্য ভালো, ঘাটে এসেই দেখি ট্রলার ছেড়ে দিচ্ছে। আমিও দ্রুত উঠে পড়লাম। আড়িয়াল খা’র বুকের উপর দিয়ে দ্রুতগতিতে ট্রলার চলছে।
এই রুটে যে কয়টি ট্রলার চলে সেগুলোর বডি কাঠের তৈরী নয়, সবগুলোই মাঝারি সাইজের লোহার নৌকা।
শ্যালো ইঞ্জিন বসিয়ে ট্রলার বানানো হয়েছে। উপরে ছাদ অথবা ছই না থাকায় যাত্রীদের বেশ রোদে পুড়তে হয়।
সকালে ছাতা নিয়ে না আসায় রোদে বেশ পুড়েছি। অবশ্য এখন রোদের তেমন উত্তাপ নেই। জলবায়ু পরিবর্তনে ষড়ঋতুর রূপ বেশ বদলে গেছে।
শরত শেষে এখন হেমন্তের শুরু।
নদীর দুই পাড়ে শাদা শাদা কাশফুল বাতাসে দোল খাচ্ছে। ট্রলার ও বাতাসের গতি মিলেমিশে একটু শীত শীত লাগলেও শুভ্র কাশফুলের দিকে চোখ পড়তেই সবকিছু ভুলে যাচ্ছি।
নদীর পাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর কাশফুলের মুগ্ধতায় কখন যে মাদারীপুর ট্রলার ঘাটে চলে এসেছি, বুঝতেই পারিনি। কিন্তু শহরে ঢুকেই এমন দৃশ্যের মুখোমুখি হবো, তা জানলে কী এই পথে আসি?’
তার উপরে আবার সেই চেনা জানা দৃশ্যের মুখোমুখি। বুকের ভেতর কেমন করে যেন একটা মোচড় দিয়ে উঠল।
সে যাই হোক, মাত্র এক পলকের মধ্যেই পুরো শরীরটা কেমন যেন হালকা হয়ে গেল। কিন্তু পা-দুটো এমন ভারী ও অসাড় হয়ে পড়লো যে, কিছুতেই আর এক কদমও এগিয়ে নিতে পারছি না।
আমি যত দ্রুতই হেঁটে আসার চেষ্টা করি না কেন পথটুকু আর শেষ হয় না।  কিছুক্ষণ আগেও রাস্তাটিকে এতো বড় মনে হয়নি।
এখন মনে হচ্ছে, অস্বস্তিকর এই পথটুকু কী শেষ পর্যন্ত পেরিয়ে যেতে পারব?
আল্লাহর কী খেলা। কয়েক সেকেন্ড আগেও এই পথে আমি কী স্বাচ্ছন্দেই না হেঁটে আসছিলাম।
ইট পাথরে বিটুমিন বিছানো এই পথঘাট, দালানকোঠা, গাছপালা সবকিছুই চেনা ছিল। মুখোমুখি এগিয়ে আসা এই মানুষটিও একদিন পরম প্রিয়চেনা ছিল। অথচ এখন….।
গত এক বছর ধরে ব্রাকের শিশু শিক্ষা প্রজেক্টে কাজ করছি। বাচ্চাদের নিয়ে সময়গুলো ভালোই কাটছে। অনেক কিছুই ভুলে ছিলাম। আসলে আব্বু মারা যাওয়ার পর থেকে রোজই নতুন কোন না কোন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অথচ আমার শৈশবটা কত রঙিনই না ছিল!
যখন স্কুলে পড়ি তখন জীবনটাকে মনে হত আকাশের মত বিশাল, উড়োজাহাজের মত গতিময়।
আমি, তনু, রমা, লিয়াসহ সবাই মিলে গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্ধা, চোখ-পলান্তি খেলে কাটিয়ে দিয়েছি কত শত বেলা অবেলা। আহা! কী সুন্দরই না ছিল, হারিয়ে ফেলা আমার সেই সব সোনা ঝরা দিন।
আমি স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজে পা রাখতেই কেমন করে সবকিছু পাল্টে গেল। আব্বু, আম্মু, ফয়সাল আর আমি। আমাদের ছোট্ট সংসার।
এ্যাডভোকেট আনিসুল হকের মেয়ে, কাউকে এই পরিচয় দিলেই সবাই আব্বুকে চিনে ফেলত। স্কুল, কলেজের সকল স্যারেরাই আব্বুর খুব পরিচিত ছিল। আমি যেমন স্যারদের শ্রদ্ধা করতাম, স্যারেরা দেখেছি আব্বুকে খুব শ্রদ্ধা করত।
আব্বু যে বছর কোর্টের পিপি হয়েছিল, মনে আছে আমরা সবাই কী খুশিই না হয়েছিলাম।
মাঝে মাঝে আব্বুকে নিয়ে আমার খুব গর্ব হত। ভাবতাম ইস্। আমার আব্বুকে সবাই চেনে। সম্মান করে। আমাকেও আব্বুর মত অনেক বড় হতে হবে। আমাকেও মানুষ ভালোবাসবে, সম্মান করবে।
আমি আব্বুর মত বড় হওয়ার আগেই আব্বু হারিয়ে গেল। আব্বুকে বাঁচিয়ে রাখতে আমাদের কত চেষ্টাই না ছিল। ঢাকায় আব্বুকে নিয়ে দিনের পর দিন পড়ে ছিলাম।
একদিন ডাক্তার আমাদের ডেকে বলেছিলÑআব্বুর ল্যান্সে ক্যান্সার ধরা পড়েছে। কেমো দিতে হবে।
আমরা আব্বুকে বাঁচাতে কেমো দেয়ানো শুরু করি। কিন্তু একদিন ভোর রাতে আব্বু নিঃশব্দে চলে গেল।
ছেলেবেলায় গল্প শুনেছিলাম মানুষ মারা গেলে আকাশের তারা হয়ে যায়। রোজ রাতে ছাদে উঠে আকাশের তারা দেখি আর আব্বুকে খুঁজে ফিরি কিন্তু কোথাও খুঁজে পাই না।
আব্বু মারা যাওয়ার এক মাস পরে,একদিন নাসিমা খালা আমাদের বাসায় আসলেন। আম্মু ও নাসিমা খালা আপন দুই বোন না হলেও বোনের মতই খুব ভালো রিলেশন।
বাসায় এসেই আম্মুকে বললেনÑ‘একটা খবর এনেছি ববি আপা।’
‘তাই নাকি! তো কী খবর নিয়ে এসেছ?’
‘ঋতুর জন্য একটা সম্মন্ধ আছে। ছেলে মাস্টার্স পাস করেছে। ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড খুব ভালো। আপাতত একটা প্রাইভেট ব্যাংকে চাকুরী করলেও সরকারি চাকুরীতে জয়েন করবে।’
‘তাই। তাহলে তো ভালোই হবে।’
‘শোন আপা, তুমি রাজী থাকলে আমি ছেলে পক্ষকে আসতে বলবো।’
‘তোমার দুলাভাই মারা যাওয়ার পর থেকে আমার মাথাটা একেবারেই গেছে। আমি এখন অনেক কিছুই চিন্তা করতে পারি না।’
‘তাহলে আপা ঋতুকে দেখতে আসতে বলে দেই।’
‘ঠিক আছে, বল দিয়ো। ভালো একটা ছেলে দেখে ঋতুকে বিয়ে দিতে পারলে আমারও একটা দায়িত্ব শেষ হয়।’
‘তুমি ঠিকই বলেছ ববি আপু,ফয়সাল ঢাকায় পড়াশোনা করলে, তোমাদের দেখাশোনার জন্য হলেও একটা ছেলে দরকার।’
হঠাৎ একদিন কলেজ থেকে বাসায় এলে আম্মু বললো,‘ঋতু,আজ তোকে দেখতে আসবে। ছেলে পছন্দ হলে কাবিন করে দেব।’
আম্মুকে একটু মুচকি হেসে বলেছি,‘ও..আচ্ছা…তাই।’
মনে মনে আমি খুব খুশি হই। আমাকে দেখতে আসবে। ব্যাপারটাই আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছিল। কিন্তু কাউকে বুঝতে দিচ্ছিলাম না। আমার কেবল মনে হচ্ছিল আমি কী তাহলে খুব বড় হয়ে গেলাম!
আমি নিজেকে নিজেই বোঝাতে থাকি,ঠিকই তো। আমি এখন স্কুল পেরিয়ে কলেজে পড়ি। আমাকে তো কেউ দেখতে আসতেই পারে। এতে অবাক হওয়ার কী আছে।
মনের মধ্যে আমার নানা রকমের অযথা চিন্তা ভাবনা ঘুরতে থাকে। চোখের ভেতরে নানা রংয়ের স্বপ্ন আঁকতে থাকি।
মনে আছে সেদিন আমার রুমের দরজা-জানালা বন্ধ করে আয়নার দিকে তাকিয়ে কী ভীষণ অবাক হয়ে যাই। নিজেকে যেন বার বার নতুন করে আবিষ্কার করতে থাকি। আমার মনের ভেতরে নতুন সুর বেজে ওঠে।
নিজেকে মনে হয়, না-তো আমি অনেকের চেয়ে অনেক সুন্দরী। আমার চোখ দুটি কী ভীষণ মায়াময়। মুখটা ঠিক যেন জীবনান্দ দাশের বনলতা সেনের চেয়ে বেশি কারুকার্যময়।
এসব কথা ভাবতে ভাবতে মনে হচ্ছিল আমার শ্যাম শুভ্রময় চেহারাটি লজ্জায় লাল হয়ে উঠছে। আমি আর ভাবতে পারি না। সেদিন রাতেই আম্মু, নাসিমা খালা  সবাই মিলে রেজাউলের সাথে কাবিন করে দেয়।
কাবিনের পর থেকে আমি যেন আর সেই আমি রইলাম না। আমার আমি’র সাথে রেজাউল যোগ হল। প্রথম প্রথম রেজাউলের কাছে যেতে খুব লজ্জা পেতাম।
ইস্। সে কী লজ্জা!
লজ্জায় নিজেকে শক্ত করে গুটিয়ে রাখতাম।
ও..ই আমার সমস্ত লজ্জা আস্তে আস্তে ভাঙতে শুরু করে। ভাঙতে ভাঙতে সে নিজের মত করে গড়তে থাকে।
যে মানুষটিকে বিয়ের আগে কোনদিন দেখিনি, সেই মানুষটিই হয়ে উঠল আমার পরম প্রিয়। আস্তে আস্তে আমিও রেজাউলকে ভালোবাসতে শুরু করি। শুরু হয় আমাদের উত্তাল দিন, উত্তাল রাত।  
আমরা প্রচুর পাগলামি করতাম। আমার চেয়ে রেজাউল-ই বেশি করত। ইচ্ছে মত এই শহরের অলি গলি, জোসনা ঝরা রাতে আড়িয়াল খা’র পাড়ে মটরসাইকেল নিয়ে আমরা হারিয়ে যেতাম। এইসব নতুন সুখের ভীড়ে আমার রঙিন কলেজ জীবনটাকে ভুলেই গিয়েছিলাম।
বিয়ের পরে ছয় মাস যেতে না যেতেই রেজাউল নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করলো। নানা রকমের ইশারা ইঙ্গিতে তা বোঝাতে চেষ্টা করত। আমি ব্যাপারগুলো প্রথমে সরল চোখেই দেখতে থাকি। শ্যামল রংয়ের কালো মেয়ে বলে, আমাকে এখন নাকি ভালো লাগে না। আগে যেখানে প্রতিদিনই রেজাউল আমাদের বাসায় আসত, এখন সেখানে পনের দিন হয়ে গেলেও আসতো না।
একদিন এসে বলেই ফেললো,‘তোমার চেয়ে সুন্দরী মেয়ে চাইলেই বিয়ে করতে পারি। সেটা কী জানো?’
আমিও পাল্টা বলে ফেলি,‘তুমি কী ভেবেছ, তোমার চেয়ে সুন্দর ছেলে আমি বিয়ে করতে পারি না।’
‘ঠিক আছে, তুমি যদি পার কাউকে বিয়ে করে ফেল।’
আমি অবাক হয়ে রেজাউলের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকি। আমি আর কোন কথা বলতে পারছিলাম না।
প্রথম দিকে এসব কথাগুলো মা’কে বলিনি। মা শুনলে খুব কষ্ট পাবে। আমাদের বিয়ের প্রায় এক বছর হয়ে এলেও আমাকে ও’দের বাড়িতে তুলে নেওয়ার কথা কখনো বলে না। কেন তুলে নিচ্ছিল না, এখন ব্যাপারটি আমার কাছে পুরোপুরি পরিষ্কার।
এভাবেই ও’র সাথে আমার ঝড়টা শুরু হয়েছিল। এরপর ফোনে অথবা সরাসরি দেখা হলে আমাদের এই বিরক্তিকর, অশান্তির এই খুঁনসুটি বাড়তে থাকে। এক সময় এমন পর্যায়ে গেল যে আমাদের যোগাযোগটাই পুরো বন্ধ হয়ে গেল। আমিও নাছোড় বান্দা, কোন যোগাযোগ করি না। রেজাউলও কম নয়।
রেজাউলের বড় ভাই ঢাকায় চাকুরী করে। মাসে একবার কী দুইবারের বেশি বাড়িতে আসে না।
অনেকের মুখে খবর নিয়েছি, রেজাউল বাড়িতে বড় ভাবী ও তার দুই বছরের ছোট এক ভাতিজাকে নিয়ে থাকে। বড় ভাবী দেখতে বেশ সুন্দরী।
বয়সও খুব বেশি নয়। সাতাশ আটাশ বছরের বিবাহিত এক তরুণী বললে ভুল হবে না।
আমার আর বুঝতে কিছু বাকী রইল না। ভাবীকে বাড়িতে একা রেখে কেন এখন আর আমার কাছে ও’ আসতে চায় না।
তিন বছর হয়ে গেল রেজাউলের সাথে আমার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। জীবনটাকে গুছিয়ে নিতে এখনো আমি বিয়ে সাদির কথা চিন্তা করিনি কিন্তু রেজাউলকে এখনো ভুলতে পারিনি। ওর প্রতিটি ছোঁয়া এখনো কাঁটা হয়ে আমাকে যন্ত্রনা দেয়।
সেদিন তনু হঠাৎ ফোন করে বললো, ‘খবর শুনেছিস ঋতু?’
‘কী খবর, বল।’
‘গতকাল রেজাউল বিয়ে করেছে?’
কথাটি শুনেই বুকের ভেতরে ঠাস করে একটা বারি খেলাম। এমন একটা খবর শুনবো সেটা ভাবিনি। আমি আর কথা বলতে পারছিলাম না। শুধু বললাম, ‘তাই নাকি, ভালোই হয়েছে।’বলেই ফোনটা রেখে দিলাম।
কিন্তু আজকেই এভাবে রাস্তায় রেজাউল আর তার নতুন বউয়ের সাথে মুখোমুখি দেখা হয়ে যাবে, ভাবিনি।
আমার সামনে দিয়ে মটরসাইকেলের পেছনে নতুন বউকে বসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
আমার চোখ যেন ওদের চোখের উপরে রাখতেই হয়, তাই গাড়ির গতি কমিয়ে ধীরে ধীরে আমার চোখের সামনে দিয়ে যাচ্ছে। আমার যে কেমন লাগছিল তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।
আমি দ্রুতই হেঁটে আসার চেষ্টা করছি কিন্তু আমাদের মুখোমুখি এই সামান্য পথটুকু যেন আর কিছুতেই শেষ হয় না।
ওরা দুজনে হয়তো এই শহরের অলি গলি, জোসনা ঝরা রাতে আড়িয়াল খা’র পাড়ে হারিয়ে যাবে। অথচ একদিন এসব কিছুই একান্ত আমার ছিল।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে বাসায় এসে পড়েছি। তবুও বুকের ভেতর কেমন যেন হা-হা-কার করে উঠছে।
অনেক দিন বুকের ভেতরে লুকিয়ে থাকা রক্তে মাংসে পোষা নীল পাখিটা কাঁদে না, আজ ভীষণ রকম কাঁদতে ইচ্ছে করছে। ঘরের দরজা, জানালা, আলো বন্ধ করে কোল বালিশটাকে জড়িয়ে আমি কাঁদছি..কিন্তু কেউ শুনছে না।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সুব্রত দেব নাথ

সিনিয়র নিউজরুম এডিটর

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com