নিবরাস ছদ্মনামে ঝিনাইদহে ছিলেন!

৩৪ বার পঠিত

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি : ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় সন্ত্রাসী হামলাকারী জঙ্গি নিবরাস ইসলাম পরিচয় গোপন করে ‘সাঈদ’ নামে ঝিনাইদহ শহরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন বলে জানা গেছে।

 

এলাকাবাসী জানিয়েছে, হামদহ সোনালীপাড়ার কমিশনার নজরুল ইসলাম সড়কের ২১১ নম্বর বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন নিবরাস। এ নিয়ে ঝিনাইদহের প্রশাসন ও সাংবাদিকদের মধ্যে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

 

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, নিবরাস ইসলামের সঙ্গে মোস্তফাসহ আরো ৭/৮ যুবক ওই ভাড়া বাসায় থাকতেন। সোনালীপাড়া মসজিদের ইমাম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দাওয়া বিভাগের ছাত্র রোকনুজ্জামান তাদেরকে এই বাসা ভাড়া নেওয়ার ব্যাপারে সহায়তা করেন। নিবরাস ওরফে সাঈদ গত ২৮ জুন পর্যন্ত প্রায় চার মাস ওই ভাড়া বাসায় ছিলেন।

 

বাড়ির মালিক সেনাবাহিনীর প্রাক্তন সার্জেন্ট কওছার আলী মোল্লার স্ত্রী বিলকিস নাহার জানান, তিনি নিবরাসকে ‘সাঈদ’ বলে জানতেন। গত সোমবার বিলকিস একটি বেসরকারি টেলিভিশনের অনুসন্ধান দলের কাছে নিবরাস ইসলামের ছবি দেখে কথিত সাঈদ বলে শনাক্ত করেন।

 

বৃহস্পতিবার দুপুরে ঝিনাইদহের একদল সাংবাদিক কওছার আলী মোল্লার বাড়িতে যান। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিলকিস বলেন, ‘গুলশান হামলায় সন্দেহভাজন জঙ্গি নিবরাস ওরফে সাঈদ কি না জানি না।’ কারণ হিসেবে তিনি টিভি দেখেন না বলে জানান। তবে গত সোমবার ঢাকা থেকে আসা টিভি সাংবাদিক যে ছবি দেখিয়েছেন সেই ছবির সঙ্গে তার বাড়ি ভাড়া নেওয়া সাঈদের চেহারার মিল রয়েছে বলে তিনি জানান।

 

ঝিনাইদহ শহরের সোনালীপাড়ার বাসিন্দা স্থানীয় সরকার কেসি বিশ্ববিদালয় কলেজের ছাত্র নওর জামিল বর্ষণ জানান, সাঈদ (নিবরাস) তাদের পাড়ায় চার মাসের বেশি সময় ভাড়া ছিল। তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবেন বলে তাদের কাছে জানান। এ সময় সাঈদ তাদের সঙ্গে ফুটবল খেলতেন। তিনি অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলতে পারতেন। এ জন্য সবাই তাকে পছন্দ করত।

 

বর্ষণ আরো জানান, ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজন জঙ্গিদের ছবি প্রকাশের পর তারা তাজ্জব হয়ে যান। তাদের সঙ্গে খেলা করা সেই সাঈদই নিবরাস বলে তারা ছবি দেখে জানতে পারেন।

 

এদিকে জঙ্গি নিবরাসকে সহায়তার দায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে ঝিনাইদহ থেকে পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে।

 

এরা হলেন- ঝিনাইদহ শহরের সোনালীপাড়ার ঠান্ডু মোল্লার ছেলে কওছার আলী মোল্লা, তার দুই ছেলে ঝিনাইদহ কলেজের ছাত্র বিনছার আলী, নারিকেলবাড়িয়া কলেজের ছাত্র বেনজির আলী, হামদহ সোনালীপাড়া মসজিদের ইমাম যশোরের ঝিকরগাছার নায়রা গ্রামের রোকনুজ্জামান ও শারশিনা মাদ্রাসার ছাত্র আদর্শপাড়া কচাতলার মাদ্রাসা শিক্ষক আবুল কালাম আজাদের কিশোর ছেলে হাফেজ আব্দুর রব।

 

গত ৬ জুলাই সন্ধ্যার সময় এদের আটক করে নিয়ে যাওয়া হয় বলে দাবি করেন বিলকিস। তিনি আরো দাবি করেন, ঈদের দিন (৭ জুলাই) তাকেও ঝিনাইদহ র‌্যাব ক্যাম্পে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর আগের দিন সন্ধ্যায় (৬ জুলাই) একটি বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা তার স্বামী, দুই ছেলে, মসজিদের ইমাম ও তারাবির নামাজের হাফেজকে নিয়ে যায়।

 

এ বিষয়ে ঝিনাইদহ জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজবাহার শেখ বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। তাদের কে আটক করেছে, কেন করেছে, বলতে পারছি না।’

 

তবে ঝিনাইদহ সদর থানার বিদায়ী ওসি হাসান হাফিজুর রহমান ঝিনাইদহ প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে কথা প্রসঙ্গে জানিয়েছিলেন, ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় সন্ত্রাসী হামলার সন্দেহভাজন এক জঙ্গি ঝিনাইদহ শহরের হামদহ এলাকায় ভাড়া থাকতেন।

 

বুধবার বিকেল থেকে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল ঝিনাইদহ থেকে পাঁচ সন্দেহভাজন জঙ্গি আটকের খবর প্রচার করে। এ নিয়ে ঝিনাইদহ সাংবাদিকদের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়। বৃহস্পতিবার ঝিনাইদহ শহরের সোনালীপাড়ায় একাধিক সাংবাদিক সরেজমিন তদন্ত করেন।

 

সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে আরো কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। পাশাপাশি সচেতন মানুষের মাঝে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। সোনালীপাড়ার প্রাক্তন সেনাসদস্যের ভাড়া বাসার ওই সাঈদই যদি নিবরাস হয়, তবে সে ঝিনাইদহ থাকা অবস্থায় জেলায় কিছু আলোচিত হত্যা সংঘটিত হয়, যেগুলোতে সে জড়িত থাকতে পারে।

 

এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে- হিন্দু সম্প্রদায়ের দুই পুরোহিত, খ্রিষ্টান হোমিও চিকিৎসক ও শিয়া মতবাদের এক ব্যক্তিকে হত্যা। এই চার হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আইএস দায় স্বীকার করে বিবৃতি প্রচার করে, যার সঙ্গে গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় সন্ত্রাসী হামলার মিল রয়েছে।

 

গত ৭ জুন ঝিনাইদহ সদর উপজেলার করোতিপাড়া গ্রামের আনন্দ গোপাল গাঙ্গুলি খুন হন। নিহত আনন্দ গোপালের বাড়ি ও নিবরাস ইসলাম ওরফে সাঈদ যে বাসায় ভাড়া থাকতেন সেই বাসার মালিক কওছার আলী মোল্লার বাড়ি একই গ্রাম বাগডাঙ্গা করোতিপাড়ায়। এ নিয়ে অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মাঝে নানা সন্দেহ ঘুরপাক খাচ্ছে। অনেকের মন্তব্য- র‌্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দাদের নজর ফাঁকি দিয়ে ঝিনাইদহ শহরকে নিরাপদ হিসেবে গড়ে তুলেছে সন্দেহভাজন জঙ্গিরা। এই অঞ্চলের সাহসী ও উগ্র মনোভাবের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলেদের জঙ্গি হিসেবে গড়ে তুলেছে।

 

এর আগে গত ৭ জানুয়ারি ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কালুহাটি গ্রামের বেলেখাল বাজারে খ্রিষ্টান হোমিও চিকিৎসক সমির বিশ্বাস ওরফে সমির খাজা ও ১৪ মার্চ কালীগঞ্জ শহরের নিমতলা এলাকার শিয়া মতবাদের হোমিও চিকিৎসক আব্দুর রাজ্জাককে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। সর্বশেষ গত ১ জুলাই ঝিনাইদহ সদর উপজেলার উত্তর কাস্টসাগরা গ্রামে স্থানীয় রাধামদন মঠের সেবায়েত শ্যামানন্দ দাসকে (৬২) কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

 

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সুব্রত দেব নাথ

সিনিয়র নিউজরুম এডিটর

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com