জাতীয় পতাকা উত্তোলনের নিয়মাবলী নিয়ে লক্ষ্মীপুরে এক মুক্তিযোদ্ধার অভিমত

৮৮ বার পঠিত

কিশোর কুমার দত্ত, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি: যুদ্ধচলাকালীন বিএলএফ’র (মুজিব বাহিনী) লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলা (থানা) ডেপুটি কমান্ডার মো: মশিউল আলম হান্নান জাতীয় পতাকার সংক্ষিপ্ত বিবরণ ও উত্তোলনের নিয়মাবলী নিয়ে অভিমত প্রকাশ করেছেন। বৃহস্পতিবার সকালে নববার্তা ডট কমকে তিনি তার এই অভিমত প্রকাশ করেন।

আলাপকালে তিনি জানান, মার্চ ২, ১৯৭১ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের পশ্চিম গেইটের ছাদে,“স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ” এর সিদ্ধান্তে-কেন্দ্রীয় ছাত্র-সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে প্রথম পতাকা উত্তোলন করা হয়। বুকের মাঝে সোনার বাংলার ছবি নিয়ে তৈরি তাদের লাল সবুজ পতাকা তখনকার ছাত্রনেতা আ.স.ম আবদুর রব এর হাত দিয়ে। ৩ মার্চ পল্টনের ছাত্র-জনসভায় স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ ও ৭মার্চ রেসকোর্সের জনসভায় বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ এই পতাকা উত্তোলন করা হয়। ২৩ মার্চ ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের সঙ্গে এ পতাকা আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলিত হয় ছাত্র-জনতার সমাবেশে। স্বাধীনতার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন ছিল অসম্ভব প্রেরণাদায়ী ঘটনা। সেই প্রেরণা সঞ্চারিত হয় পুরো জাতির মধ্যে, মুক্তিকামী বাঙালির বুকে বুনে দেয় সাহসের বীজ। এরপরের ঘটনা সবার জানা।

এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আমরা অর্জন করি আমাদের প্রিয় মানচিত্র, আমাদের স্বাধীনতা। এই পতাকা আজ ভালবাসা আর  শ্রদ্ধার উপলক্ষ, আমাদের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। বিজয় অর্জনের ৪৬ বছর পরেও তাই একটুও কমে যায়নি জাতীয় পতাকার প্রতি আমাদের ভালবাসা আর শ্রদ্ধা। একারণেই ক্রিকেটে বাংলাদেশ জিতলে ভিক্টরি ল্যাপ দিতে বা শাহবাগে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা বিরোধীদের প্রতিবাদ করতে সবার আগে আমরা মাথায় কিংবা বুকে জড়িয়ে নিই আমাদের লাল সবুজ পতাকা।

বিজয়ের মাস এলেই ব্যবহার বেড়ে যায় আমাদের পতাকা উত্তোলনের আগ্রহ। বাড়ির ছাদে বা গাড়িতে এমনকি রাস্তায় বা স্কুল ব্যাগে সব জায়গা ছেয়ে যায় জাতীয় পতাকায়। বিজয়ের আনন্দ এবং উদযাপনে এরচেয়ে ভাল প্রতীক আর কী হতে পারে। তবে এই অকৃত্রিম শ্রদ্ধার প্রকাশ করতে গিয়েই ভুলে কিংবা অসাবধানতা বশত: আমরা না জেনেই করে ফেলি আমাদের জাতীয় পতাকার অবমাননা। করে ফেলি দেশদ্রোহিতার মত বড় অপরাধ। ভুল মাপে তৈরি বা ভুল নিয়মে জাতীয় পতাকার ব্যবহার দন্ডনীয় অপরাধও বটে।

এক নজরে আমরা জেনে নিই জাতীয় পতাকা উত্তোলনের সঠিক ব্যবহার,
পতাকার মাপ :
বাংলাদেশের পতাকা আয়তাকার। এর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের অনুপাত ১০:৬ এবং মাঝের লাল বর্ণের বৃত্তটির ব্যাসার্ধ দৈর্ঘ্যরে পাঁচ ভাগের এক ভাগ, পতাকার দৈর্ঘ্যরে কুড়ি ভাগের বাম দিকের নয় ভাগের শেষ বিন্দুর ওপর অঙ্কিত লম্ব এবং প্রস্থের দিকে মাঝখান বরাবর অঙ্কিত সরল রেখার ছেদ বিন্দু হলো বৃত্তের কেন্দ্র। পতাকার দৈর্ঘ্য ১০ ফুট হলে প্রস্থ’ হবে ৬ ফুট, লাল বৃত্তের ব্যাসার্ধ হবে ২ ফুট, পতাকার দৈর্ঘ্যরে সাড়ে ৪ ফুট ওপরে প্রস্থের মাঝ বরাবর অঙ্কিত আনুপাতিক রেখার ছেদ বিন্দু হবে লাল বৃত্তের কেন্দ্রবিন্দু। তবে, ব্যবহারের ভিন্নতার কারণে পতাকার মাপও ভিন্ন হতে পারে তবে অবশ্যই অনুপাত ঠিক রেখে। ভবনে ব্যবহারের জন্য পতাকার বিভিন্ন মাপ হলো ১০ ফুটঃ ৬ ফুট, ৫ ফুটঃ ৩ ফুট, ২.৫ ফুটঃ ১.৫ ফুট । অর্থাৎ যত বড় ভবন তত বড় পতাকা । অনুরূপ ছোটবড় মোটরগাড়িতে ব্যবহারের জন্য পতাকার বিভিন্ন মাপ হলো ১৫ ইঞ্চিঃ ৯ ইঞ্চি, ১০ ইঞ্চিঃ ৬ ইঞ্চি এবং আন্তর্জাতিক ও দ্বিপাক্ষিক অনুষ্ঠানে ব্যবহারের জন্য টেবিল পতাকার মাপ হল ১০ ইঞ্চিঃ ৬ ইঞ্চি । এমন মাপের বাইরেও পতাকা তৈরি করা যাবে। সেক্ষেত্রে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিতে হবে ।
কখন এবং কিভাবে :
বিভিন্ন জাতীয় দিবসে সরকারি ও বেসরকারি ভবন, বাংলাদেশ কূটনৈতিক মিশন ও কনস্যুলেটে পতাকা উত্তোলন করতে হবে। তবে শোক দিবসে পতাকা অর্ধনমিত থাকবে । পতাকা অর্ধনমিত রাখার ক্ষেত্রে প্রথমে পতাকা শীর্ষস্থান পর্যন্ত ওঠাতে হবে। তারপর পতাকার প্রস্থের অর্ধনমিত অবস্থানে রাখতে হবে। দিনের শেষে পতাকা নামানোর সময় আবারও শীর্ষস্থান পর্যন্ত উঠিয়ে তারপর নামাতে হবে। সরকারের অনুমতি ব্যতীত জাতীয় পতাকা কখনওই অর্ধনমিত রাখা যাবে না। এছাড়া সব কর্ম-দিবসে সকল সরকারি ভবনে পতাকা পূর্ণ মর্যাদায় উত্তোলিত হবে ।

* কি কি করা যাবে না :
জাতীয় পতাকার ওপর কিছু লেখা অথবা মুদ্রণ করা যাবে না। এমনকি কোন অনুষ্ঠান উপলক্ষে কিছু আঁকাও যাবে না। মিছিলের ক্ষেত্রে সামনের সারিতে ডানে বা মাঝখানে রাখতে হবে। কোন অবস্থাতেই বাম পাশে নয়। বাংলাদেশের পতাকার ঊর্ধ্বে অন্য কোনও পতাকা উত্তোলন করা যাবে না। কোনও যানবাহনের হুডে, ছাদে কিংবা পেছনে প্রদর্শন করা যাবে না । কোন অনুষ্ঠানে দুই বা তার বেশি পতাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে সবার আগে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হতে হবে। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পতাকা উত্তোলিত রাখা যাবে। তবে যানবাহন বা সরকারি বিশেষ অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হতে পারে। পুরনো বা জরাজীর্ণ পতাকা অন্য কোন কাজে ব্যবহার করা যাবে না। মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। আমাদেরকে এতসব নিয়ম কানুন বা বিধিনিষেধ দেখে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই। জাতীয় দিবস কিংবা সাফল্যে পতাকা আমাদের উদযাপনের অনুষঙ্গ হতেই পারে। কেননা এইটাই যে আমাদের পরিচয়। আমাদের পতাকার মান রাখার দায়িত্ব আমাদেরই।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কিশোর কুমার দত্ত, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি #

কিশোর কুমার দত্ত, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি। মোবাইলঃ 01714-953963, ইমেইলঃ kkumar3700@gmail.com

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com