আজ মহান বিজয় দিবস, বিজয়ের সাজে রাজধানী

আজ মহান বিজয় দিবস। এ দিনটি জাতির জন্য পরম গৌরবের। ১৯৭১ সালের এই দিনে ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ শেষে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আত্মসমর্পণ করেছিল পাক হানাদার বাহিনী। চূড়ান্ত বিজয়ের মধ্য দিয়ে অভ্যুদয় ঘটে বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের।  বিজয়ের অনুভূতি সবসময়ই আনন্দের। তবে একই সঙ্গে দিনটি বেদনারও। অগণিত মানুষের আত্মত্যাগের ফসল আমাদের স্বাধীনতা। আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের; যেসব নারী ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, তাদের। এদিনে আমরা স্মরণ করব ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধিকার আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে যারা আত্মত্যাগ করেছেন, তাদেরও।

এদেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার তথা স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সফল নেতৃত্ব দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কোটি কোটি মানুষকে তিনি স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে তুলেছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন একই লক্ষ্যে অবিচল একদল রাজনৈতিক নেতা। স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমেও আমাদের জাতীয়তাবোধকে শাণিত করে তোলা হয়েছিল। একটি চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের মাধ্যমে এ জাতিকে স্তব্ধ করে দেয়া ছিল অসম্ভব।

আজ থেকে ৪৩ বছর আগে একরাশ স্বপ্ন বুকে নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল। ৪ দশকের বেশি সময়ের এ পথপরিক্রমায় সে স্বপ্নের কতটা পূরণ হয়েছে, আজ সে হিসাব মেলাতে চাইবে সবাই। এর মধ্যে আমাদের অনেক চড়াই-উৎরাই মোকাবেলা করতে হয়েছে। রাজনীতি এগিয়েছে অমসৃণ পথে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অনাকাঙ্খিত ঘটনায়। জনবহুল ও সীমিত সম্পদের এ দেশকে স্বয়ম্ভর করে তোলার কাজও সহজ ছিল না। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কঠিন দিনগুলোয় রাষ্ট্রের প্রশাসনযন্ত্র চালু করতে হয়েছিল।

স্বাধীন দেশের উপযোগী একটি সংবিধানও প্রণয়ন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রয়োজন ছিল গণতান্ত্রিক ও মুক্ত পরিবেশে নিরবচ্ছিন্ন যাত্রার। সদ্যস্বাধীন দেশের নেতৃত্বের এ বিষয়ে অঙ্গীকারের অভাব ছিল না। দুর্ভাগ্যজনক যে, পরে এক্ষেত্রে মারাত্মক বিচ্যুতি ঘটে এবং তার খেসারত দিতে হয় জাতিকে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মতো মানবসম্পদ সূচকে আজও বিশ্বসমাজের পেছনের সারিতে আমাদের অবস্থান। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়লেও দারিদ্র্য এখনও প্রকট। নতুন করে জনসংখ্যার ঊর্ধ্বগতি এ সমস্যা বাড়িয়ে তুলছে।

 

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেলেও সুশাসন যেন সোনার হরিণ। সাংবিধানিক সংস্থা শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা এখানে আজও দুর্বল। অব্যাহত সংস্কারের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে সর্বস্তরে পৌঁছে দেয়ার ব্যাপারে অঙ্গীকারের অভাব পীড়াদায়ক। রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর বিভক্তি; এর পাশাপাশি জাতীয় প্রশ্নে অনৈক্য আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে। দেশে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি এখনও তৎপর। যুদ্ধাপরাধের বিচার চলছে। ৪ জন যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ডও কার্যকর করা হয়েছে বিজয় দিবসের প্রাক্কালে। সমগ্র বিচার সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলে তা এ ধরনের অপশক্তির তৎপরতা রোধে সহায়ক হবে, আশা করা যায়। এতে আইনের শাসন জোরদার করার পথও সুগম হবে। অর্থনৈতিকভাবেও আমাদের আরও এগিয়ে যেতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত মূল্যবোধ রক্ষায় হতে হবে যত্নবান। তবেই বিজয় হয়ে উঠবে অর্থবহ।

যে কোনো জাতির শক্তির প্রধান উৎস ঐক্য। প্রায় সব ক্ষেত্রেই অগ্রগতির জন্য প্রয়োজন এটি। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিজয়ের পেছনে কাজ করেছিল মত-পথ-জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ। এজন্যই সম্ভব হয়েছিল আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত শক্তিশালী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে মাত্র নয় মাসে পরাজিত করা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে স্বাধীনতার পর আমরা সে ঐক্য ধরে রাখতে পারিনি। গুরুত্বহীন বিষয়েও রাজনৈতিক বিভক্তি দেশে গণতন্ত্রের ভিত সুদৃঢ় করার পথে বড় অন্তরায় হয়ে রয়েছে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে আমাদের নেতৃত্বকে। সেই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোয় অভিন্ন নীতি অনুসরণ অপরিহার্য।

আমাদের সামনে সম্ভাবনা অসীম। জাতীয় ঐক্য ছাড়া তা যথার্থভাবে কাজে লাগানো যাবে না। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সব সমস্যা মোকাবেলায় সচেষ্ট হলে আমাদের অগ্রগতি ঘটবে দ্রুত। বিভেদ ভুলে আমরা সে পথেই অগ্রসর হব- এই হোক আমাদের বিজয় দিবসের অঙ্গীকার। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া পৃথক বাণী দিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি: রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ মহান বিজয় দিবসের বাণীতে দলমত নির্বিশেষে সকলকে মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ও চেতনা বাস্তবায়নে নিজ নিজ অবস্থান থেকে অবদান রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে মুক্তিযোদ্ধাদের অপরিসীম ত্যাগ ও বীরত্ব গাথা চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। 
দেশবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, দীর্ঘ ৯ মাস সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে তা এই দিনে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের মধ্যদিয়ে পরিপূর্ণতা পায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ একটি সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলায় পরিণত হোক এটাই আমার প্রত্যাশা।’ প্রধানমন্ত্রী: মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণীতে বলেন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাসের কোন আকস্মিক ঘটনা নয়। জাতির জনকের অবিসংবাদিত নেতৃত্বে বাঙালি জাতির দীর্ঘ তেইশ বছরের স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত ফসল ছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ।’

আগামী দিনের বাংলাদেশ জাতির পিতার কাঙ্ক্ষিত সোনার বাংলা হবে এ প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘সেখানে ধনী-দরিদ্র ভেদাভেদ থাকবে না এবং সকলের জন্য সম্ভাবনার দুয়ার থাকবে অবারিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধুর খুনীদের ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে। জেলখানায় জাতীয় ৪ নেতা হত্যার পুনর্বিচার ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়েছে। দেশে আইনের শাসন ও মানবাধিকার সমুন্নত রাখতে সব হত্যাকাণ্ডের বিচারে সরকার বদ্ধপরিকর।’

বিরোধী দলীয় নেতা: বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া তার বাণীতে দেশবাসীকে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন, ‘শোষণ-বঞ্চনামুক্ত একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় নিয়েই ১৯৭১ সালে এদেশের মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে আমাদের গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়েছে, জনগণের মৌলিক ও মানবিক অধিকার খর্ব হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই এদেশের গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষ লড়াই-সংগ্রামের মাধ্যমে গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার পুনরুদ্ধার করেছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন তিনি।’

 [huge_it_slider id=”3″]

বিজয়ের সাজে সেজেছে রাজধানী ঢাকা। মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন সড়ক, সড়ক দ্বীপ ও ভবনে শোভা পাচ্ছে বর্ণিল আলোকসজ্জা। সন্ধ্যার পর রংবেরংয়ের আলোকচ্ছটায় ঝলমলিয়ে ওঠে এলাকাগুলো। আলো দিয়ে তৈরি করা হয় প্রিয় লাল-সবুজ পতাকা। মনকাড়া এমন আলোকসজ্জায় মুগ্ধ অনেকেই। 

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
২৭ বার পঠিত

Leave a Reply